প্রতিদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। খালের ওপর ছোট্ট সেতুটিতে লাঠিতে ভর দিয়ে এসে দাঁড়ান প্রায় ৮৫ বছর বয়সী দুই বৃদ্ধ কৃষক মো. আব্দুল মান্নান ও মো. আজহার উদ্দিন। দূরের সড়কে কোনো সরকারি গাড়ির বহর দেখা গেলেই কাঁপা পায়ে এগিয়ে যান তাঁরা। মনে একটাই আশা—এই বুঝি প্রধানমন্ত্রী এলেন।
বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের ঐতিহাসিক স্বনির্ভর খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অপেক্ষা করছেন দুই বৃদ্ধ। তাঁদের মতো গ্রামের আরও অনেক কৃষকেরও প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একদিন খালটি পরিদর্শনে আসবেন। কিন্তু প্রতিবারই গাড়িবহর চলে যায়, মানুষ ফিরে যায়; অপূর্ণই থেকে যায় তাঁদের অপেক্ষা।
আব্দুল মান্নান ও আজহার উদ্দিনের বাড়ি স্বনির্ভর খাল থেকে মাত্র ৩০-৪০ মিটার দূরে। খালটি তাঁদের কাছে শুধু সেচের উৎস নয়, জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। ১৯৭৮ সালে তাঁরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বনির্ভর কর্মসূচির আওতায় খাল খননে স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিয়েছিলেন।
সেই সময় চরকাউয়া এলাকায় প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ স্বনির্ভর খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী মোস্তফা আলী শিকদারের নেতৃত্বে কৃষকদের অংশগ্রহণে খননকাজ সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপতিকে কাছ থেকে দেখার সেই স্মৃতি এখনো ধরে রেখেছেন দুই বৃদ্ধ কৃষক।
পরে ১৯৭৯ সালে তাঁদের প্রতিবেশী ও তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মৌলভী মোস্তফা আলী শিকদার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে উপহার হিসেবে একটি সাদাকালো ‘ন্যাশনাল’ টেলিভিশন পান। সেই টেলিভিশনে রাষ্ট্রপতির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখতেন গ্রামের মানুষ। সেখান থেকেই জিয়াউর রহমানের প্রতি দুই কৃষকের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আরও গভীর হয়।
কয়েক দশকের অবহেলা, দখল ও ভরাটের কারণে একসময় খালটি কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। দেখা দেয় তীব্র জলাবদ্ধতা। শত শত একর কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। দুর্ভোগে পড়েন এলাকার কৃষকরা।
২০২৫ সালের ২২ ও ২৫ আগস্ট খালটির দুরবস্থা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উদ্যোগে খালটির পুনঃখনন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ধাপে পূর্ণাঙ্গ খননকাজও এগিয়ে যায়।
পুনঃখননের পর স্বনির্ভর খাল এখন আবার পানিতে ভরপুর। খালের মাঝখানে গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন একটি দ্বীপ। কৃষিজমিতে ফিরেছে সেচের পানি। কৃষকের মুখে ফিরেছে ফসলের হাসি।
খাল পুনঃখনন শুরুর পর বিভিন্ন সময় সরকারি কর্মকর্তা, প্রশাসনের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা খালটি পরিদর্শনে আসেন। এসব দেখে আব্দুল মান্নান ও আজহার উদ্দিনের মনে নতুন করে আশা জাগে। প্রধানমন্ত্রী বরিশাল সফরে আসবেন—এমন খবর পেয়ে তাঁদের প্রত্যাশাও বেড়ে যায়।
গত ১৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বরিশালে এলেও স্বনির্ভর খালে আসেননি। এতে হতাশ হন দুই বৃদ্ধ কৃষক। বিশেষ করে আজহার উদ্দিনের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন আবারও অপূর্ণ থেকে যায়।
এরপর গত ২৭ জুলাই সকালে বিশাল গাড়িবহর নিয়ে স্বনির্ভর খালে আসেন সরকারের তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দূর থেকে গাড়ির বহর দেখে দুই বৃদ্ধ কৃষক ভেবেছিলেন, হয়তো প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। কিন্তু কাছে গিয়ে জানতে পারেন, প্রধানমন্ত্রী নন, এসেছেন তথ্যমন্ত্রী।
হতাশ হয়ে ফিরে আসেন তাঁরা। দীর্ঘক্ষণ খালের দিকে তাকিয়ে ছিলেন আব্দুল মান্নান ও আজহার উদ্দিন। তাঁদের মনে তখন একটাই প্রশ্ন—আর কত অপেক্ষা?
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দুই কৃষকের এখন আর বড় কোনো চাওয়া নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁরা শুধু একবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বনির্ভর খালের তীরে দেখতে চান। তাঁর সঙ্গে একবার করমর্দন করে বলতে চান, ‘আমি সেই কৃষক, যিনি আপনার বাবার সঙ্গে এই খাল খনন করেছিলাম।’
স্বনির্ভর খাল নতুন প্রাণ ফিরে পেলেও দুই বৃদ্ধ কৃষকের সেই প্রতীক্ষার এখনো অবসান হয়নি। খালের পাড়ের ছোট্ট সেতুটিতে তাই প্রতিদিনই তাঁদের চোখ থাকে দূরের সড়কের দিকে। হয়তো কোনো একদিন সত্যিই আসবেন কাঙ্ক্ষিত সেই অতিথি—আর পূর্ণ হবে তাঁদের বহু বছরের অপেক্ষা।
এফপি/ফ