কাগজে-কলমে প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন, ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়েছে সরকারি বরাদ্দের পুরো অর্থ। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে মিলেছে ভিন্ন চিত্র। কোথাও একই সড়কের নাম পরিবর্তন করে দুটি প্রকল্প দেখানো হয়েছে, কোথাও পুরোনো সিসি ঢালাই সড়ককেই নতুন কাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আবার কবরস্থান সংস্কারের নামে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও সেখানে কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়নে।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিলমারী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় ১২৪টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে শুধু থানাহাট ইউনিয়নেই ৪৪টি প্রকল্পে প্রায় ৯৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গ্রামীণ সড়ক, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে এসব বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ প্রকল্পেই বাস্তব কাজের সঙ্গে কাগুজে হিসাবের মিল নেই।
সরেজমিনে বজরা তবকপুর এলাকায় দেখা যায়, ‘ইউসুফ আলী মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি থেকে কালিরপাঠ মন্দির’ এবং ‘ইউসুফ মিলিটারীর বাড়ি থেকে আহম্মেদ আলী মিলিটারীর বাড়ি’—নামে একই সড়কের জন্য দুটি পৃথক প্রকল্পে এক লাখ ২০ হাজার টাকা করে মোট দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। কিন্তু ওই সড়কে নতুন কোনো উন্নয়নকাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
একই এলাকার মজাইডাঙা জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থান সংস্কারের জন্য পাঁচ লাখ ৭০ হাজার ৫২৪ টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও সেখানে সংস্কারকাজের কোনো আলামত নেই। আজমের বাড়ি থেকে আইয়ুবের বাড়িমুখী রাস্তা সংস্কারের জন্য পাঁচ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়দের দাবি, আগেই নির্মিত সিসি ঢালাই সড়ককেই নতুন কাজ হিসেবে দেখিয়ে বরাদ্দ সমন্বয় করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কৃঞ চন্দ্র, হরিশ চন্দ্র, বজলার রহমান ও তানিয়া খাতুন বলেন, বর্ষা এলেই সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অথচ একই সড়কের নামে দুটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাচাবান্দা এলাকায় ‘মেইন রাস্তা থেকে প্রিন্সের বাড়ি’ পর্যন্ত সড়ক সংস্কারের জন্য দুই লাখ ২৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে ওই নামে কোনো সড়কের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী জানান, চলাচলের জন্য তারা এখনও অন্যের উঠান ব্যবহার করেন।
একই ওয়ার্ডের প্রামাণিকপাড়ায় পুকুরপাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণে তিন লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে শুধু পুরোনো ঢেউটিন ও বাঁশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পুকুরে মাটি ভরাট কিংবা গাইড ওয়াল নির্মাণের কোনো কাজ হয়নি। কেবল সড়কে কয়েক গাড়ি মাটি ফেলা হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
মাচাবান্দা কালামের চাতাল মেইন রোড থেকে ডিপঘর পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও স্থানীয় হামিদুল ইসলাম ও জয়নাল হক বলেন, আগের ইউপি সদস্যের আমলে কিছু মাটি কাটা হয়েছিল। এরপর আর কোনো উন্নয়ন হয়নি। একই ধরনের অনিয়ম রয়েছে ওয়ার্ডটির আরও কয়েকটি প্রকল্পে।
এদিকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট কুষ্টারী এলাকায় আব্দুল বারী সরকারের বাড়ি থেকে উমর হাজির বাড়ি পর্যন্ত সড়ক সংস্কারে তিন লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে আগে থেকেই এইচবিবি প্রকল্পের কাজ চলছিল। এরপরও একই স্থানকে কাবিটা প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এ ছাড়া মণ্ডলপাড়া পাকা রাস্তা থেকে আব্দুল কাইয়ুমের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে দুই লাখ নয় হাজার ১০০ টাকা এবং একই সড়ককে ভিন্ন নামে দেখিয়ে আরও এক লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। অথচ সড়কটি আগে থেকেই সিসি ঢালাই থাকায় নতুন কোনো কাজ হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে ২ নম্বর ওয়ার্ডের কিসামতবানুসহ ইউনিয়নের আরও কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে।
এ বিষয়ে প্রকল্পের তালিকা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতিদের নাম জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের কর্মচারীরা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল রহমানের অনুমতি ছাড়া এসব তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, গত এক মাস ধরে ওই কর্মকর্তা কার্যালয়ে অনুপস্থিত। তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ টি এম বেনজীর রহমান বলেন, ‘আমি বর্তমানে মাঠপর্যায়ে আছি। অফিসে ফিরে বিষয়টি বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এফপি/ফ