দীর্ঘ সাত বছর ধরে অচল অবস্থায় থাকা কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নোঙর করা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন মেঘনা অয়েল কোম্পানির ভাসমান তেল ডিপোর (বার্জ) প্রধান মিটার ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ রাতের আঁধারে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও জ্বালানি ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি টের পেয়ে সংশ্লিষ্টরা কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যান বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
রমনা মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আশেক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘রাতে ডিপোর মিটার খুলে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে চলে আসেন।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাত ১০টার দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের নন্দীরমোড় এলাকায় নোঙর করা মেঘনা অয়েল কোম্পানির ভাসমান ডিপোতে বাঘাবাড়ি মেঘনা ডিপোর অফিস সহকারী আমজাদ হোসেনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী যান। অভিযোগ রয়েছে, তারা ডিপোর জ্বালানি পরিমাপের প্রধান মিটার খুলে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও জ্বালানি ব্যবসায়ীরা সেখানে উপস্থিত হলে তারা কাজ শেষ না করেই চলে যান। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা সংকট এবং বড় জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলে সমস্যার কারণ দেখিয়ে ২০১৮ সালে চিলমারীর দুটি ভাসমান তেল ডিপোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। যমুনা অয়েল কোম্পানির বার্জটি ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি এবং মেঘনা অয়েল কোম্পানির বার্জটি একই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে তেলশূন্য অবস্থায় রয়েছে। এরপর থেকে কোটি টাকার সরকারি এই স্থাপনাগুলো অচল অবস্থায় নদীতে পড়ে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ডিপো দুটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এরই অংশ হিসেবে শনিবার রাতে মেঘনা অয়েল কোম্পানির বার্জ থেকে মিটার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ডিপোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, প্রথমে তারা আগত দলটিকে বার্জে উঠতে দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র রয়েছে বলে জানানো হলে তারা বার্জে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, মিটার কক্ষের তালা চাবি দিয়ে খুলতে না পেরে সেটি ভাঙার চেষ্টা করা হয়। এ সময় তালা ভাঙার শব্দ শুনে স্থানীয় তেল ডিলার হযরত আলী ও আশপাশের কয়েকজন বাসিন্দা সেখানে পৌঁছালে সংশ্লিষ্টরা কাজ বন্ধ রেখে চলে যান।
স্থানীয়দের দাবি, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, নৌপরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত চিলমারীর ভাসমান তেল ডিপো। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা জনসম্মুখে সিদ্ধান্ত ছাড়াই রাতে যন্ত্রাংশ অপসারণের চেষ্টা উদ্বেগজনক।
তেল ডিলার হযরত আলী বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে মিটার খুলে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এলাকার মানুষ বিষয়টি জানতে পেরে সেখানে গেলে তারা চলে যায়। চিলমারীর এই ডিপো সরানোর কোনো উদ্যোগ হলে আমরা তা মেনে নেব না।’
রংপুর বিভাগ ট্যাংক-লরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল হক সর্দার বলেন,‘চিলমারীর ডিপো উত্তরাঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয়দের মতামত ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনব।’
এ বিষয়ে মেঘনা তেল ডিপোর ভারপ্রাপ্ত ডিপো সুপার মো. জাকির হোসেন বলেন,‘রংপুর অঞ্চলে বর্তমানে তেলের সংকট রয়েছে। বাঘাবাড়ি ডিপোতে জ্বালানি সরবরাহের চাপও বেশি। সেখানে ব্যবহৃত মিটারটিতে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। চিলমারীর ডিপোটি দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় এখানকার মিটারটি সাময়িকভাবে বাঘাবাড়িতে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাঘাবাড়ির মিটারটি মেরামত হলে চিলমারীর মিটার আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’
এফপি/অ