যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকে অবশ্যই ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া এই পারমাণবিক চুক্তি অনুমোদন পাবে না।
ট্রাম্প লিখেছেন, “বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি—যেখানে কোনও ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ থাকবে না এবং যা কেবল সামরিক নয়, শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য—তা অনুমোদন করা হবে। তবে সেটি পুরোপুরি নির্ভর করবে সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ওপর।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময় এলো, যখন নতুন পারমাণবিক চুক্তিটি নিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে কিছু মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব।
তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, এই চুক্তির আওতায় কোনও ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি থাকবে না।
সৌদির পুরোনো অবস্থান অপরিবর্তিত
এদিকে সৌদি আরব বহুবার জানিয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পথ তৈরি না হলে তারা ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না।
এ কারণে ট্রাম্পের নতুন শর্ত মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পরও এ বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস কী?
২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও বাহরাইন প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।
পরবর্তীতে সুদান, মরক্কো এবং কাজাখস্তানও এই চুক্তিতে যোগ দেয়।
দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবকেও এই চুক্তির অংশ করার চেষ্টা করে আসছেন ট্রাম্প। তবে গাজা যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে উত্তেজনার কারণে রিয়াদ এখন পর্যন্ত সে পথে এগোয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি
বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তাদের দাবি, এই সমঝোতার মাধ্যমে সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি হবে এবং দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
ইরান ইস্যুও বড় কারণ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি।
২০১৮ সালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সৌদি যুবরাজ ও দেশটির কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন, সৌদি আরব নিজে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে না।
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন, “ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও যত দ্রুত সম্ভব একই পথে হাঁটবে।”
এই বক্তব্যের কারণেই নতুন পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে অতিরিক্ত সতর্কতা দেখা দিয়েছে।
কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায়
চুক্তিটি এখন পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- উভয় দলের কিছু আইনপ্রণেতা এই চুক্তির বিরোধিতা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষেই রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিরোধীরা চুক্তিটি আটকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি অনুমোদন পেলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ককেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে না; একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ভারসাম্য, ইসরায়েলের সঙ্গে আরব বিশ্বের সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
এফপি/র