মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর গুলিতে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। নিহত যুবকের নাম মুজিবুর রহমান মুজিব (২৬)। তিনি উপজেলার দত্তগ্রাম এলাকার লইযারচর গ্রামের বাসিন্দা এবং আজিজুর রহমান (অজিব)-এর ছেলে। এ ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং নিহতের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলের দিকে দত্তগ্রাম সীমান্তসংলগ্ন মনু নদীর চর এলাকায় ভারতের তারবেড়া সীমান্তের কাছাকাছি স্থানে যাওয়ার সময় বিএসএফ সদস্যদের গুলিতে তিনি নিহত হন। ঘটনার পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মরদেহটি ভারতের উনকোটি জেলার একটি হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য রাখা হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন শরীফপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিপা রানী দাস। তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় গুলিতে এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ চলছে।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে পৃথক বক্তব্য দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবি সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারে যে, শুক্রবার সন্ধ্যায় কুলাউড়া উপজেলার দত্তগ্রাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে কয়েকজন বাংলাদেশি ব্যক্তি ভারতীয় সীমান্তের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে চোরাচালান কার্যক্রমে জড়িত ছিল। এ সময় ভারতের লাঠিয়াপুড়া বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের বাধা দেয়।
বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, বিএসএফ সদস্যদের বাধা উপেক্ষা করে চোরাকারবারীদের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের দিকে অগ্রসর হলে বিএসএফ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়ে। এতে একজন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে নিহত ব্যক্তির পরিচয় মুজিবুর রহমান মুজিব হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
বিজিবি আরও জানায়, ঘটনার সময় সেখানে থাকা অন্যরা পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসে এবং বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহত ব্যক্তি পূর্বেও সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
৪৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক সরকার আসিফ মাহমুদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী শ. ই. সরকার জবলু। তিনি বলেন, “সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও উদ্বেগজনক। সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হতে না হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে আসছে। তারা সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।
নিহতের স্বজনরা মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে দাফনের ব্যবস্থা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার এ ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এফপি/অ