খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা।
গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু আক্রান্ত আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে পাঁচ দিনের মধ্যে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
এ নিয়ে চলতি বছরে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে। এর মধ্যে খুলনা জেলায় মারা গেছেন ১৩ জন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়ভাবে উদ্বেগও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১৩ জন সরকারি এবং ২২ জন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এক দিনে এত রোগী ভর্তি হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ বাড়ছে।
খুলনায় সর্বোচ্চ ৫৩ রোগী ভর্তি
জেলাভিত্তিক হিসাবে গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন খুলনায়—৫৩ জন। এর মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন ২৭ জন। এ ছাড়া বাগেরহাটে ২৪, যশোরে ১০, ঝিনাইদহে ৮, সাতক্ষীরায় ৫, কুষ্টিয়ায় ৪ এবং মাগুরা ও মেহেরপুরে দুজন করে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৬৯০ জন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩ হাজার ১৬২ জন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩৮ জনকে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে।
পাঁচ দিনে মৃত্যু চারজনের
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেন জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সোমবার খুলনায় একজন এবং ১৪ আগস্ট আরও দুজনের মৃত্যু হয়।
চলতি বছরে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জন খুলনা জেলার। শুধু খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের। বাগেরহাটে মারা গেছেন একজন।
খুমেক হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে ৮০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২৭ জন। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১২৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। জেলার অন্যান্য হাসপাতাল মিলিয়ে আরও ১৮৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে।
চার ওয়ার্ড রেড জোন
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—১১১ জন। ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে আক্রান্ত হয়েছেন ১০০ জন।
রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৮০ জন এবং ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ‘কমলা জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ওয়ার্ডে মোট ২৬৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আর ১৫, ২০, ২৫ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ১১৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
মশক নিধনে জোর কেসিসির
কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মীউল ইসলাম জানান, নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে প্রতিদিন ডেঙ্গু শনাক্তের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ওয়ার্ডভিত্তিক আক্রান্তের তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় ঝুঁকি বিবেচনায় নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রের মাধ্যমে মশক নিধনের পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থান ও বড় নালায় হুইল ব্যারো ফগার মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় জমে থাকা পানি ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করছে কেসিসি।
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নগরীতে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে দিনরাত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি লিফলেট বিতরণ ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চলছে। বিভিন্ন হাসপাতালে মনিটরিং সেলও গঠন করা হয়েছে।
ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতিতে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা নগরবাসীকে বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র ও নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এফপি/ফ