হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহানের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একইসঙ্গে জনস্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিরও প্রতিবাদ জানানো হয়।
শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে এ মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা ‘প্রতিরোধযোগ্য হাম রোগে নিষ্পাপ সম্ভাবনাময় শিশু হত্যার জন্য দায়ী ইউনূস-নূরজাহান গংদের বিচার ও মৃত শিশুদের ক্ষতিপূরণ’ দাবি জানান। এ সময় সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো মৃত শিশুদের প্রতিকৃতি (মোটিফ) প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হয়।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ইউনূস সরকারের গাফিলতিতে আজ হাজারো শিশু মৃত্যুর মুখে। ইতোমধ্যে সরকারি হিসেবে ৫ শতাধিক শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যার বলি হয়েছে সাধারণ পরিবারের নিষ্পাপ শিশুরা। এজন্য ইউনূস সরকারের সংশ্লিষ্টদের বিচার করতে হবে। এছাড়া দেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি করে দেশের স্থায়ী ক্ষতি করা হয়েছে। এই চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান বক্তারা। একই সঙ্গে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিরসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
কর্মসূচির শুরুতে অভিনেতা জুটন দাশের আহ্বানে টিকা সংকটে মৃত শিশুদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ক্রিয়েটিভ রাইটার্স-এর মুখপাত্র কবি কুতুব হিলালির সঞ্চালনায় মানববন্ধনের মূল দাবিগুলো উপস্থাপন করেন চলচ্চিত্র পরিচালক, কলাম লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট এস এম কামরুজ্জামান সাগর।
মানববন্ধনে সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী সাকিল আহমদ (অরণ্য) বলেন, “সরকারি গাফিলতির কারণে অকালে চলে গেছে শতশত শিশু। গত কয়েক সপ্তাহের পরিসংখ্যান আমাদের ব্যথিত করেছে। আজকে আমরা এখানে শুধু কান্না করতে আসিনি; আমরা এসেছি বিচার দাবি করতে। ৫ শতাধিক শিশুর মৃত্যু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি পরিকল্পিত এক মানবিক বিপর্যয়। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যকর টিকা ব্যবস্থা বাতিল করে ভ্যাকসিন ক্রয়নীতি হঠাৎ পরিবর্তন করা হয়। এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। আমরা জানতে পেরেছি, ইউনিসেফ বারবার নূরজাহান বেগমকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সতর্কবাণী উপেক্ষা করা হয়। প্রশ্ন রাখছি, ড. ইউনূস সাহেব, যিনি সারা বিশ্বে উন্নয়নের পুরস্কার পেয়েছেন, তিনি কীভাবে বাংলাদেশের শিশুদের রক্তের দায় এড়িয়ে চলতে পারেন? বিচারহীন এই জবাবদিহিতার সংস্কৃতি আর নয়।”
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে সাকিল আহমদ বলেন, একদিকে হামে শিশু মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতি হুমকির মুখে ফেলে একটি ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (Reciprocal Trade Agreement) স্বাক্ষর করেছে; যা আসলে এক ধরনের অর্থনৈতিক আত্মসমর্পণ। এই চুক্তি অনুযায়ী সয়াবিন, ভুট্টা এবং মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করতে বাধ্য হবে। যা দেশের কৃষকদের ধ্বংসের মুখে ফেলবে।
অ্যাডভোকেট চৈতালি চক্রবর্তী বলেন, “আমি চাই ইউনূস, তার সহযোগী নূরজাহান এবং তার উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে। এরা দেশটাকে লুট করেছে। এরা যেন কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খায়ের উদ্দিন শিকদার বলেন, ড. ইউনূস পরিকল্পিতভাবে (মেটিকুলাস ডিজাইনে) ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশটাকে নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছেন। বাঙালি বুঝতে পেরেছে ইউনূসের কারণে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে। সাংবাদিক হাসান আহমেদ সংহতি প্রকাশ করে অবিলম্বে হামের জবাবদিহিতা ও মার্কিন ঔপনিবেশিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান।
সমাজকর্মী শাহরিয়ার নাফিস জয় বলেন, ইউনূস সরকারের অধিকাংশ কর্মকাণ্ডই দেশবিরোধী। বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করে এনে সরকার পরিচালনা করেছে। দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। এদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন নাট্যজন এহসানুল আজিজ বাবু, সাংবাদিক সোহেলী চৌধুরী, শান্তা ফারজানা, মোমিন মেহেদী, অভিনেতা রূপক দেহলভি এবং সাংবাদিক মাজহারুল ইসলাম মাসুম প্রমুখ।
মানববন্ধনে উপস্থিত শাহজাহানপুরের দিনমজুর মোক্তার হোসেন বলেন, “আমি আমার এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিলাম। এখানে প্রতিবাদ দেখে দাঁড়ালাম। ইউনূস দেশটাকে ধ্বংস করেছে। আমরা জীবনে হামে মৃত্যুর কথা শুনিনি। এখন মহামারির মতো বাড়ছে। আমার ভাতিজা হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে। টিকা কিনল না কেন? এর জবাব ইউনূসকে দিতেই হবে।”
মানববন্ধনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সমাজকর্মী ফারহানা আফরোজ রুনা, নাট্য নির্মাতা রাজিব হাসান, এক্টিভিস্ট মোফাজ্জল ইসলাম রুবেল, হাসিব শেখ প্রমুখ।
মানববন্ধন থেকে উত্থাপিত ১০ দফা দাবি:
১. টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা ও হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।
২. জনস্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা।
৩. জুলাই ২০২৪-এর কোটা আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার।
৪. অগ্নিসন্ত্রাস, লুটপাট ও মব কালচারের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা।
৫. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আটক রাজবন্দিদের মুক্তি।
৬. সব রাজনৈতিক দলের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিশ্চিত করা।
৭. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
৮. তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার।
৯. আইসিটি আদালতে রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ করা।
১০. সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা।
সমাপনী বক্তব্যে বক্তারা বলেন, দ্রুত ১০ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিবাদী মিছিল বের করা হয়।
সমাপনী বার্তায় বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি অনতিবিলম্বে এই ১০ দফা দাবি মেনে নেওয়া না হয়, তবে আগামীতে সারাদেশে আরও কঠোর ও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিবাদী মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলে ‘আমার শিশু মরল কেন, ইউনূস তুই জবাব দে’, ‘মার্কিন গোলামি চুক্তি বাতিল করো, করতে হবে’—এমন বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে বিচার দাবি করা হয়।
এফপি/এমআই