জ্বালানি সংকটের কারণে বাড়ানো হয়েছে তেলের দাম। তবে মূল্যবৃদ্ধির পরও কমেনি ভোগান্তি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গতকাল সকাল থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বাড়তি দামের সঙ্গে করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। ফলে বিপাকে পড়েছেন গাড়ির মালিক, চালক ও সাধারণ যাত্রীরা।
রাজধানীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। এতে কেবল চালকরাই নয়, সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এর আগে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকার গত শনিবার মধ্যরাত থেকে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর করেছে। নতুন দামে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বেড়েছে।
রাজধানীর বাইরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ছিল তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন। তীব্র গরমের মধ্যে অপেক্ষা করতে হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কৃষি ও পরিবহন খাতেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় গত রোববার ডিজেলের বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭ হাজার লিটার, পেট্রোল ২৮ হাজার ৫০০ লিটার এবং অকটেন মাত্র ২ হাজার লিটার। কিন্তু চাহিদার তুলনায় এ সরবরাহ ছিল অপ্রতুল। ফলে দুপুরের আগেই অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড টানানো হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে অনেক মোটরসাইকেল চালককে ফিরে যেতে হয়েছে। ফুয়েল কার্ডধারীরাও তেল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
কুষ্টিয়ার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোটরসাইকেল চালক আমিরুল ইসলাম বলেন, বেতন বাড়ছে না, কিন্তু যাতায়াত খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে গেছে। তার ওপর দিনের অর্ধেক সময় চলে যায় তেল সংগ্রহ করতে। দাম বাড়ল ঠিকই, ভোগান্তি কমল না।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কৃষকেরা। বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে সেচকাজে ডিজেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরা জানিয়েছেন, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেচ পাম্প ও ট্রাক্টরের ভাড়াও বেড়ে গেছে। আবার পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
মেহেরপুরের বামন্দী ও গাংনী এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দেখা গেছে তেলের জন্য দীর্ঘ সারি। প্রখর রোদের মধ্যে অপেক্ষমাণ এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, আগে যেখানে ৫ হাজার টাকায় প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যেত, এখন সেখানে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা লাগছে। দাম বাড়লেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় জনদুর্ভোগ আরও তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেজায় খুশি হয়েছেন পেট্রোলপাম্প মালিকরা। সেই খুশিতে সরকারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন তেল ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তেল ব্যবসায়ীরা এত খুশি কেন—এমনটি নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে অনেকের মনে। ইতোমধ্যে ফেসবুকে এসব নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। এর আগে তেলের দাম বৃদ্ধির পর এভাবে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো ঘটনা আর ঘটেনি। কেউ কেউ তো রসিকতা করে বলছেন, পেট্রোল পাম্প মালিকরা কেবল সরকারের পক্ষে মিছিল করতে বাকি রেখেছেন।
কিন্তু এই খুশির কারণ কী—কেউ কি জানেন? কেউ কেউ মনে করছেন, সংকটের সুযোগে মজুত করে রাখা তেল এখন বের করে রাতারাতি পয়সা বানাবেন অনেকে। তবে এর পরিমাণ খুব বেশি হবে, এমন নয়।
তবে জনগণের ভোগান্তি হলেও কমিশন বৃদ্ধির এই খুশি প্রকাশ করায় সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে বিপাকে আছেন তেল ব্যবসায়ীরা। হঠাৎ এই খুশির কারণ কী—জানতে চাইলে কেউ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে চাইছেন না। এই প্রতিবেদক কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান।
একজন পাম্প-মালিক অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘কমিশনের তো একটা বিষয় আছেই। দাম বাড়লে কমিশন বাড়ে। এতে তাদের কিছুটা স্বস্তিও হয়।’
এফপি/অ