আকস্মিক বন্যায় ক্ষতি, ইটের ভাটার জন্য কৃষি জমি থেকে মাটি উত্তোলন, পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফার, বৈদ্যুতিক মিটার, তারসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে সম্ভাবনাময় মুহুরী সেচ প্রকল্প। চট্টগ্রামের মিরসরাইসহ ফেনী উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয় ২শ’৩২ কোটি টাকায় ‘মুহুরী সেচ প্রকল্পের ৮৫০টি স্কীম’ নির্মাণ কাজ। প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এর সুবিধা নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। সেচ নির্ভরতা কমিয়ে তারা ঝুঁকে পড়ছেন রবি শস্যেও দিকে। ফলে এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন হলেও তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না কৃষি উন্নয়নে।
আর এই সুযোগে একটি শ্রেণী চেষ্টা চালাচ্ছে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের। জানা গেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বাস্তবায়িত প্রকল্পটিকে ‘ব্যর্থ প্রকল্প’ হিসেবে দেখানোরও চেষ্টা করেন।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ১৭ জুন দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে সরকারের অনুদান ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ‘ইরিগেশন ম্যানেজমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (আইএমআইপি) ফর মুহুরি ইরিগেশন প্রজেক্ট (থার্ড রিভাইসড) শীর্ষক প্রকল্পটি একনেক অনুমোদন করে।
২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ফেনীতে মুহুরী সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মাঝে করোনার কারণে দুই বছর কাজ বন্ধ ছিলো। ২০২৪ এর জুনে প্রকল্প শেষ হয়। ৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইন নির্মানের মাধ্যমে পরিকল্পিত ৮৫০টি স্কিমের মধ্যে চালু হয়েছে ৩৩৮টি।
২০২৪ সালের ভয়াবহ আবস্মিক বন্যায় তলিয়ে যায় পুরো প্রকল্প এলাকা। এতে প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন মোটর পাম্প, ভূ-গর্ভস্থ পানি সঞ্চালন লাইন, প্রি-পেইড মিটার, ইলেকট্রিক বোড ইত্যাদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সবগুলো স্কিম কমিশনিং করে কৃষকেদের নিকট বুঝিয়ে দিলেও সেচ চালু করা সম্ভব হয়নি। সোনাগাজীসহ ফেনীর পাঁচটি উপজেলা ও চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শুরু হয় এ প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ৩ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে।
মুহুরি সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করে উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর স্কীম/সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের মাধ্যমে সেচের পানি সরবরাহ, প্রিপেইড মিটার, সার্ভার সিস্টেম ও বৈদ্যুতিক পাম্প ব্যবহার করে ৮৫০টি স্কীম/পাম্পের মাধ্যমে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান ও উন্নততর ব্যবস্থাপনা,পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাই ছিলো প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, পরামর্শক দফতরের কর্মকতাদের সরাসরি তদারকিতে ৮৫০টি স্কিমের গুণগতমান বজায় রেখে যথাযথভাবে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। পরামর্শক,ফেনী বিভাগীয় দপ্তর, ঠিকাদার প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সকল স্কিম কমিশনিং করে স্থানীয় কৃষক প্রতিনিধি/পাম্প অপারেটরের কাছে হস্তান্তরও করা হয়। কিন্তু প্রকল্পটির বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে স্থানীয় চাঁদাবাজ ও স্বার্থান্বেষী মহল বাঁধা সৃষ্টি করে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ বরাবর বেনামী দরখাস্ত দিতে থাকে। এরই একটি পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রথম দফায় ২০২৩ সাল জনৈক ব্যক্তি প্রকল্পের জার্মানির ঠিকাদারের (লুড ইউং পাইফার অ্যান্ড গং) বিরুদ্ধে প্রাক্কলনের নির্ধারিত দরের চেয়ে ১৩শতাংশ উচ্চ দরে কাজ নেয়া, সেচ প্রকল্পে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে করা, ভিটি বালু দিয়ে প্লাস্টার করা, ২ নম্বর ইট ব্যবহার, বাংলা রড ব্যবহার, নিম্ন মানের ইউভিসি পাইপ, লোহার কেসিং পাইপ, বালু ছাড়া পাইপলাইন স্থাপনের অভিযোগ তুলে দুদকে বেনামী দরখাস্ত দেয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে দুদক বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেয়। এ প্রেক্ষিতে তিন সদস্যের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু ওই তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়ন যখন শেষের দিকে, তখন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ট্রান্সফরমার চুরি সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগটির তদন্তে দেখা যায়, ট্রান্সফরমার চুরি রোধের দায়িত্বটি ছিলো পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির। চুরিকৃত ট্রান্সফরমারসমূহ ঠিকাদারের ইন্সুরেন্সের আওতায় প্রতিস্থাপন করা হয়। ফলে এ অভিযোগ তদন্তে প্রতিষ্ঠা করা যায় নি।
মুহুরী সেচ প্রকল্পটি শেষ হয় ২০২৪ সালে। প্রকল্প চালু হওয়া মাত্র ওই বছর আগস্টে ফেনী এবং আশপাশের অঞ্চলে হানা দেয় স্মরণকালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা। বন্যা উপদ্রুত অঞ্চল না হওয়া সত্ত্বেও আকস্মিক বন্যায় স্থানীয়রা হয়ে পড়েন হতভম্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কারণ বন্যা হতে পারে-এমন কোনো পূর্বাভাসই ছিলো না। এর ফলে ওই অঞ্চলের কৃষি, গবাদি,ঘরবাড়ি,বসতিসহ সব ধরণের অবকাঠামো মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যায় মুহুরীসহ অন্যান্য নদীর অন্তত ৯৬টি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙ্গে যায়। বাঁধ উপচে ফেনী, মিরসরাই প্রকল্প অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে পানিতে তলিযে যায়। এ সময় প্রকল্প অঞ্চল ১২ থেকে ১৫ দিন পানির অন্তত ১০টি পানির গভীর নিমজ্জিত ছিলো। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পের প্রায় সকল পাম্প, মোটর, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, প্রি- পেইড মিটারিং সিস্টেম, সার্ভার সিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত প্রকল্পের স্কীমসমুহ মেরামত/পূনর্বাসনের লক্ষ্যে ২০ কোটি টাকার তাৎক্ষণিক চাহিদা নিরূপন করা হয়। প্রকল্পের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রেক্ষিতেব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি ‘গাইডলাইন’ ও একটি ‘এক্সিট প্ল্যান’ অনুমোদন করে পাউবো’র ফেনী দফতরগুলোর মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে স্কীমসমুহ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করে স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা সংগঠন, কৃষক প্রতিনিধি,পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সহযোগিতায় প্রকল্পটি পরিপূর্ণভাবে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর এটি পরিচালনার দায়িত্ব পড়েছে ফেনীস্থ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর। প্রকল্প শেষ হওয়ার দেড় বছর পর স্থানীয় এক কৃষক প্রতিনিধি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আবারো অভিযোগ দেন। আবারো তিন সদস্যের বিভাগীয় ব্যবস্থার আওতায় তদন্ত কমিটি গঠন করে পাউবো। সেই অভিযোগেরও বাস্তবিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বাঁধা কোথায়-জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প পরিচালক (বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী-পুর) মো: রাফিউস সাজ্জাদ বলেন, শুরুর পর থেকেই একটি মহল স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের সঙ্গে একাট্টা হয়ে মুহুরী সেচ প্রকল্প কার্যকরে বাঁধাগ্রস্ত করেছে। সরকার পরিবর্তনের পর সেই চক্রটিই এখন ভয়াবহ বন্যা, অবৈধ মাটি কাটা ও ট্রান্সফর্মার চোরচক্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে বাঁধা সৃষ্টিতে। স্থানীয়রা প্রকল্পের সুফল যাতে ঘরে তুলতে না পারে এ লক্ষ্যে এখনো এরা এখানে-ওখানে অভিযোগ দাখিল করে চলেছে। একতরফা প্রপাগান্ডা অব্যাহত রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১টি সাবস্টেশনসহ ২৩৮কি:মি: বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হয়। বাপাউবো ও পল্লী বিদ্যুতের সাথে সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী এগুলো মেরামত, রক্ষনাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির। পবিস এগুলো যথাযথভাবে রক্ষনাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে ট্রান্সফরমার চুরিজনিত কারনে প্রকল্পটি অকার্যকর হয়ে পড়বে। এছাড়া মুহুরী পানি ব্যবস্থাপনা সংগঠনের দায়িত্ব অপরিসীম। স্কীমের নিরাপত্তা দেয়া, ছোট ছোট মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষণ কাজের দায়িত্ব ও হস্তান্তরকৃত স্কীমের পানি ব্যবস্থাপনা দলের উপর ন্যাস্ত। অর্থাৎ সকল পক্ষের দায়দায়িত্ব পালন, বন্যার কারনে ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ স্কীমসমুহ পুনর্বাসনের মাধমে প্রকল্পটি সম্পর্ণরূপে কার্যকর করা সম্ভব। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের মতে এ ধরনের জটিল সেচ প্রকল্পের সম্পূর্ণ সেচ সুবিধার অন্তত ৮০% পেতে হলে ৫ বছর নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
প্রকল্পের কাজের উপর ইতোমধ্যে ৫(পাঁচ) বার তদন্ত করা হয়েছে কিন্তু কোন অভিযোগ প্রমানিত হয়নি। এটি একটি পাইলট প্রকল্প, এর স্বার্থকতার উপর অনুরূপ অন্য প্রকল্প গ্রহন করা সুযোগ থাকবে। প্রকল্প প্রনয়নকালে কোন ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলে তা সাধারণত বাপাউবো ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের দায়দায়িত্বের বিষয় প্রতিভাত হয়।
এদিকে ২শ’ ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত মুহুরী সেচ স্কীমের সুফল এখনোঘরে তুলতে পারছে না স্থানীয়রা। এর প্রধান কারণ হিসেবে জানাগেছে, মূলতঃ কৃষকের অনাগ্রহ। কৃষকরা সেচ নির্ভর ফসলের পরিবর্তে রবি শস্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এ ছাড়া বহু ট্রান্সমিটার ও পাম্প চুরি হয়ে গেছে। চুরি হয়ে গেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মালিকানাধীন বৈদ্যুতিক মিটার বোর্ড, তার এবং বৈদ্যুতিক বহু সরঞ্জাম। স্থানীয় প্রভাবশালী বালুদস্যুরা ইট ভাটার জন্য কৃষি জমি থেকে ‘টপ সয়েল’ কেটে সাবাড় করছে। অবৈধভাবে অব্যাহত মাটি উত্তোলনের ফলে সেচেরপাইপলাইনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পটি পরিপূর্ণভাবে কার্যকরে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, ইআরডি,আইএমআইডি ও এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিভিন্ন সময়ে গঠিত কমিটি সক্রিয়ভাবে মনিটরিং করে। অথচ এ সময় কোনো একটি দফতর থেকে প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়নে উদ্ভুতসমস্যাগুলোর পূর্বাভাস দেয়নি। এই সুযোগে পাউবো’র অভ্যন্তরে চিহ্নিত একটি সংঘবদ্ধ চক্র ক্সদব দুর্বিপাককে পুজি করে প্রকল্প পরিচালনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এফপি/এমআই