Dhaka, Thursday | 16 April 2026
         
English Edition
   
Epaper | Thursday | 16 April 2026 | English
প্রধান ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত
আগামীকাল হজ ফ্লাইট উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
এসএসসি পরীক্ষায় ফিরলো ‘সাইলেন্ট এক্সপেল’
৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
শিরোনাম:

আওয়ামী আমলে হাজার কোটি টাকা লোপাট, বন্দর থেকে শুরু করে সর্বত্র সিএনএস’র দুর্নীতির পাহাড়

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫২ পিএম  (ভিজিটর : ৪৫)

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে ‘কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস লিমিটেড’ (সিএনএস) নামক একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ওই দলটির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা ও অসৎ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি প্রকল্পে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে এই নজিরবিহীন লুটপাট চালিয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত সর্বত্রই সিএনএস-এর দুর্নীতির জাল বিস্তৃত। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু অভ্যন্তরীণ ও গোপন নথিপত্র এবং ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর’-এর প্রকাশিত তথ্য ও সাধারণ নাগরিক সমাজের অভিযোগের ভিত্তিতে সিএনএস-এর এই বিশাল দুর্নীতির সাম্রাজ্যের চিত্র উঠে এসেছে।

টোল আদায়ের নামে পুকুর চুরি ও দুদকের অনুসন্ধান

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান ও মামলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় বিধি (পিপিআর) সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে সিএনএস-কে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়। এরপর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই একক উৎস থেকে চুক্তির মাধ্যমে সিএনএস-কে টোল আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

এছাড়াও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানটিকে মোট টোল আদায়ের ওপর ১৭.৭৫ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ বা কমিশন গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, যা প্রচলিত নিয়ম ও যেকোনো আর্থিক যৌক্তিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এর ফলে গত ৫ বছরে সিএনএস প্রায় ৪৮৯ কোটিরও বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এই অসম চুক্তির কারণে সরকারের আনুমানিক ৩০৯ কোটি টাকার প্রত্যক্ষ আর্থিক ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে।

অনুরূপ জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর ক্ষেত্রেও। যমুনা সেতুতে মাত্র ৬ মাসের জন্য টোল সংগ্রহের দায়িত্ব পেলেও, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির মেয়াদ না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৮ বছর ধরে সেই কাজ পরিচালনা করেছে। এছাড়া, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-তেও তারা একাধিক বড় প্রকল্প বাগিয়ে নিয়েছে, যার মোট মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের চরম রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগসাজশে সিএনএস সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়সহ একাধিক সরকারি সংস্থার অধীনে কোনো প্রকার প্রতিযোগিতা ছাড়াই প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প লাভ করে। এসব প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশে স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অতিমূল্যায়ন, অস্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতা পরিহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। দরপত্রে এমন সব অদ্ভুত শর্ত রাখা হতো, যাতে সিএনএস ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাজই না পায়।

আইনি মারপ্যাঁচে প্রকল্প কুক্ষিগত রাখার কৌশল

সিএনএস-এর বিরুদ্ধে অন্যতম বড় অভিযোগ হলো, তারা দেশের আইনি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বছরের পর বছর প্রকল্প কুক্ষিগত করে রাখে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বা নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলে, তারা একাধিক ক্ষেত্রে আদালতে রিট দায়ের করে। এই রিটের মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘায়িত করে এবং নতুন দরপত্র প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে দীর্ঘ সময় ধরে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এর ফলে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে অটোমেশনের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের প্রামাণ্য দলিল

সিএনএস-এর দুর্নীতির একটি বড় উদাহরণ হলো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অটোমেশন প্রকল্প। চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক মানের বন্দরে রূপান্তরের লক্ষ্যে "Consolidation, integration and upgradation of CPA's existing ICT based facilities/systems as per TOR" শিরোনামের কাজের জন্য ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ সিএনএস-এর সাথে ১৮ কোটি ৭৯ লক্ষ ৪৮ হাজার ৭০০ টাকার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি ৫ বছর মেয়াদী ছিল, যার মেয়াদ শেষ হয় ১৮ মার্চ ২০২৪ তারিখে।

বন্দরের অভ্যন্তরীণ বোর্ড সভার এজেন্ডা ও কার্যপত্র থেকে জানা যায়, সিএনএস চুক্তির সংস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন মডিউল পরিচালনার কাজ হুট করে বন্ধ করে দেয়। মূলত বন্দরকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের জন্যই তারা এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয়।

নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিএনএস মেইনটেন্যান্স কাজের জন্য ৩ বছরে ১১ কোটি ২৭ লক্ষ ৬৯ হাজার ২২০ টাকা দাবি করে এবং চুক্তিতে ৬১ জন জনবল নিয়োগের কথা থাকলেও তারা নিয়োগ দিয়েছিল মাত্র ৪১ জন। ২০ জন জনবলের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তারা বিপুল অংকের বিল দাবি করে। পরবর্তীতে গঠিত কমিটির সুপারিশে ৪১ জন জনবলের ৯ মাস ১২ দিনের বিল বাবদ ২ কোটি ৪৭ লক্ষ ৪৫ হাজার ২৯৬ টাকা পরিশোধযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এছাড়াও মাসিক ২৬ লক্ষ ৩২ হাজার ৪৭৮ টাকা হারে মেইনটেন্যান্স বিল প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

বন্দরের নথিতে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য রয়েছে। চুক্তির ফেজ-২ এর অধীনে ৫ জন কর্মকর্তার ইউরোপ ও এশিয়ার দুটি দেশে ৭ দিনের সফরের কথা ছিল, যার ব্যয়ভার সিএনএস-এর বহনের কথা। কিন্তু সেই সফর অনুষ্ঠিত না হওয়া সত্ত্বেও সিএনএস সেই টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করে, যা পরে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য বিল হতে কর্তন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া, একটি বিল সামারি রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, সিএনএস-কে ৭ কোটি ৪৯ লক্ষ ৪৯ হাজার ৫৩৬ টাকার বিল প্রদানের প্রক্রিয়া করা হয়েছে। কাজ অসম্পূর্ণ রেখে এবং যথাযথ সেবা প্রদান না করেই তারা এভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

বর্তমান সরকারের আমলেও সক্রিয় সিএনএস চক্র

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও সিএনএস তাদের একই ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের কিছু প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ যারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, তাদের মদদে এবং বর্তমান সরকারের ১-২ জন মন্ত্রী ও কিছু অসাধু সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পরোক্ষ সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি এখনও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রভাব খাটিয়ে স্বাভাবিক দরপত্র প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে তারা বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এমনকি কাজ শেষ না করেই এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের এনওসি বা প্রত্যয়নপত্র ছাড়াই উপরমহলের চাপ প্রয়োগ করে কাজের বিল ছাড়িয়ে নিচ্ছে তারা।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি এখনও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ হতে অসাদু পন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে নতুন নতুন কাজ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

আওয়ামী আশীর্বাদপুষ্ট হলেও দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে আওয়ামী আমলেই বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকিটিং ও অটোমেশন সিস্টেম থেকে চরম বিতর্কের পর সিএনএস-কে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্য সংস্থাগুলোতে তাদের শেকড় এখনও রয়ে গেছে।

এমতাবস্থায়, "দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর"-এর পক্ষ থেকে সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন সিএনএস-এর এই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম এখনই বন্ধ করা হয়। বিগত সরকারের আমলে হওয়া সব অনিয়মের পূর্ণ তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি, বর্তমান সরকারের কোনো প্রকল্পে যেন এই স্বার্থান্বেষী মহল সুযোগ না পায়, সেদিকে কঠোর নজরদারি ও ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি উঠেছে। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জনস্বার্থ রক্ষায় এই পদক্ষেপ অত্যন্ত অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের ওয়েবসাইট থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে একজন ফোনটি রিসিভ করেন। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাদের মালিকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি ফোনটি রেখে দেন। পরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও আর রিসিভ করেনি।

এফপি/এমআই
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝