রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় দিন-রাত অবাধে চলছে কৃষি জমির উর্বর টপসয়েল কাটা ও বিক্রি। অ্যাক্সকেভেটর দিয়ে কেটে সাবাড় করা হচ্ছে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি। অনুমোদন ছাড়াই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর খনন করা হচ্ছে।
এসব মাটি শত শত ট্রাক্টরে করে সরাসরি চলে যাচ্ছে অবৈধ ইটভাটা গুলোতে। ফলে দাপটের সাথে চলাচলকারী এসব ভারী ট্রাক্টরের কারণে উপজেলার গ্রামীণ সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধুলাবালিতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও। উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নেই এখন একই চিত্র। অথচ বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৪ ও ১৫ অনুযায়ী কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন, বিক্রি ও পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অপরাধে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে আইনটির কোনো কার্যকর প্রয়োগ চোখে পড়ছে না। প্রতিদিন প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই দিন-রাত শত শত ট্রাক্টর দাপিয়ে বেড়ালেও তা বন্ধে দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরেজমিনে তাম্বুলপুর ইউনিয়নের বিরবিরিয়া ও রামগোপাল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একরের পর একর কৃষি জমির টপসয়েল কেটে নেওয়া হচ্ছে। এ সময় কাজের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শ্রমিক জানান, দোন প্রতি (প্রায় ২২ শতক) ১৬ হাজার টাকা দরে জমির মালিকদের কাছ থেকে টপসয়েল কেনা হয়েছে। তাদের দাবি, বর্তমানে পীরগাছা উপজেলায় অন্তত ২০ থেকে ২৫টি পয়েন্টে এই অবৈধ কারবার চলছে।
রামগোপাল গ্রামের মরাপোড়ার দোলায় রুবেল ও মন্তাজ নামে দুই ব্যক্তি সেখানে এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রুবেলের সঙ্গে কথা হলে তিনি নিজেকে এনসিপির তাম্বুলপুর ইউনিয়নের সদস্য সচিব পরিচয় দেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, জমির টপসয়েল কাটা আইন গতভাবে অবৈধ।
একই গ্রামের আলামিন নামে এক ব্যক্তি প্রায় দুই একর কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করে অ্যাক্সকেভেটর দিয়ে ৮–১০ ফুট গভীর পুকুর খনন করছেন। এছাড়া ছাওলা ইউনিয়নের আদম বসুনিয়াপাড়ায় আব্দুর রাজ্জাক নামে এক ব্যক্তি অনুমোদন ছাড়াই কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর খনন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভূমি ব্যবহার নীতিমালা, ২০০১ এবং ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমোদন ছাড়া কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন বেআইনি। তবে পীরগাছায় এসব আইনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ২৪টি ইটভাটা রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকলেও এসব অবৈধ ইটভাটায় নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে কৃষিজমির উর্বর টপসয়েল।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষি জমির উর্বর টপসয়েল কাটা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। অনেক কৃষক না বুঝেই মাটি বিক্রি করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও কৃষকের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে। ফসলের প্রধান পুষ্টি উপাদান আসে জমির উপরিভাগের উর্বর অংশ থেকেই। তা নষ্ট হলে জমির উৎপাদনক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাবে। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা জানান।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাক বলেন, জমির টপসয়েল কাটার বিষয়ে আমরা একাধিক অভিযোগ পাচ্ছি। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। অবৈধভাবে যারা টপসয়েল কাটছে ও বিক্রি করছে তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এফপি/জেএস