জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ' চলছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ দেওয়া হয়নি স্থায়ী কোনো পরিচালক। পাশাপাশি অনুমোদিত ২৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। প্রয়োজনীয় জনবল ও পূর্ণকালীন নেতৃত্বের অভাবে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা, প্রকাশনা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশের প্রথম ও একমাত্র নজরুল গবেষণাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১৪ সালে ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত স্থায়ী পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পরিচালনায় পর্যাপ্ত সময় দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে পূর্ণকালীন নেতৃত্বের অভাব প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. হাবিব-উল-মাওলা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ইনস্টিটিউটটির পরিচালক পদটি সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ার সঙ্গে যুক্ত, যা অন্য ইনস্টিটিউটের ক্ষেত্রে নেই। দীর্ঘদিনেও এ পদে স্থায়ী নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক কোনো অব্যবস্থাপনা রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। যোগ্য গবেষকদের মধ্য থেকে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু পরিচালক নিয়োগেই সমস্যার সমাধান হবে না, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
পরিচালক সংকটের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জনবলসংকট। অনুমোদিত ২৩টি পদের বিপরীতে মাত্র তিনজন কর্মীকে প্রশাসনিক কাজ, তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক রাশেদুল আনাম বলেন, 'স্থায়ী পরিচালক ও জনবলসংকটের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলতে পারবে। তবে এই সীমিত জনবল নিয়েই নিয়মিত গবেষণা ও প্রকাশনা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।'
নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইনস্টিটিউটটির কিছু কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগে 'নজরুল স্টাডিজ' কোর্স বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হয়। এ ছাড়া গবেষণা অনুদান প্রদান, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন এবং ভারতের নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে 'নজরুল জার্নাল' প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে পর্যাপ্ত গবেষক ও স্থায়ী নেতৃত্বের অভাবে এসব উদ্যোগের পরিধি বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
অধ্যাপক ড. মো. হাবিব-উল-মাওলার মতে, ইনস্টিটিউটটির সংকটকে শুধু অবকাঠামো কিংবা ভবনের অভাব হিসেবে দেখলে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যাবে। একাডেমিক পর্যায়ে নজরুলকে যথাযথভাবে ধারণ করার ক্ষেত্রেও এখনো ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে নতুন একটি ভবন। আগামী ডিসেম্বর মাসে ভবনটি হস্তান্তরের পর সেখানে ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজসহ আরও চারটি ইনস্টিটিউট স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, 'আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। ইনস্টিটিউটটিকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। নতুন ভবন প্রস্তুত হলে সেখানে এটি স্থানান্তর করা হবে। পাশাপাশি নজরুল গবেষণায় অভিজ্ঞ কোনো বিশেষজ্ঞকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।'
এফপি/অ