পাবনার আমিনপুরে নিরাপদ কৃষি চর্চায় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে আমিনপুরের বিকে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী সংস্থা দয়ালনগর বাহারুন্নেছা পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে এ সম্মাননা দেওয়া হয়।
আয়োজকেরা জানান, নিরাপদ খাদ্যের অভাবে দেশে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারসহ অনিরাপদ কৃষি চর্চাকে দায়ী করা হচ্ছে। এর বিপরীতে নিরাপদ ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে এ সম্মাননার আয়োজন করা হয়েছে।
আয়োজকেরা আরও জানান, এ আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আবেদন করেন। তাঁদের মধ্য থেকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কৃষকদের সম্মাননার জন্য নির্বাচিত করা হয়। বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক হিসেবে দুজনকে এক লাখ টাকা করে, প্রথম রানার-আপ হিসেবে দুজনকে ৭৫ হাজার টাকা করে এবং দ্বিতীয় রানার-আপ হিসেবে চারজনকে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থ পুরস্কার ও সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়া হয়।
সম্মাননাপ্রাপ্তরা হলেন বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক কোলে কাপড়া ও সানোয়ার হোসেন, প্রথম রানার-আপ সুলতানা খাতুন ও চাষবাস এবং দ্বিতীয় রানার-আপ প্রযন্ত, দেশি ফার্ম, শাহাদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আলী।
দেশে কৃষি খাতে বিভিন্ন ধরনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদানের প্রচলন থাকলেও অধিক ফলনের প্রত্যাশা ছেড়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনে ভূমিকা রাখার জন্য এমন সম্মাননা প্রদানকে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এ উদ্যোগে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সম্মাননাপ্রাপ্ত কৃষকেরাও।
সম্মাননাপ্রাপ্ত টাঙ্গাইলের মধুপুরের কৃষক সানোয়ার হোসেন বলেন, "ফসল আবাদের নামে মাটির ক্ষতি হয়, এমন কোনো উপকরণ ব্যবহার বা কার্যক্রম আমরা করি না। এটি করা উচিতও নয়। মা ও মাটি কখনো কাউকে ঠকায় না। একে ভালোবাসলে প্রতিদান মিলবেই। আজকের সম্মাননা এর আরেকটি উদাহরণ।"
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম বলেন, "মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করতে না পারলে আমরা নিজেরাও নিরাপদ থাকতে পারব না। আধুনিক কৃষির নামে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের আরও সচেতন হওয়া উচিত। সুষম সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ নিয়ে গবেষণা বাড়ানোরও প্রয়োজন। সরকারও নিরাপদ কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে। আজকের কৃষি সম্মাননার উদ্দেশ্যও এটি।"
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিকে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এম এ বাতেন খান বলেন, "আমাদের দেশের ৩৪ শতাংশ কৃষক ক্যানসারে আক্রান্ত বলে জানা ছিল। সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখন তা বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এভাবে আমরা অনেকেই নানা রোগে ভুগছি। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হওয়ায় এ সমস্যার বিস্তার ঘটছে। এ ক্ষেত্রে নিরাপদ বা প্রাকৃতিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে না তুললে এ সংকট দূর হবে না। তাই রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার না করে সনাতন পদ্ধতির নিরাপদ কৃষি চর্চায় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে আমাদের এ আয়োজন।" কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার এ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক রেল সচিব সেলিম রেজা, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমির (নাটা) মহাপরিচালক সাইফুল আজম, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম জামাল উদ্দিন, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মামুনুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পের কনসালট্যান্ট ড. মাহবুব আলম, দয়ালনগর বাহারুন্নেছা পাবলিক লাইব্রেরির প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এসএম আব্দুর রাজ্জাক এবং পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার প্রমুখ।
এফপি/মিব