জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার এবং গত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদের খুন, গুম ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন কর্মসংস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই ঝিনাইদহ জেলা পরিষদে ঘটলো উল্টো চিত্র। বিগত দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার জেলার অন্তত ৩৯টি পরিবারের প্রতি সহানুভূতি না দেখিয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা ও স্বজনপ্রীতির বিনিময়ে ৬টি পদের সবকটিতেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছেলে, ভাতিজা ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে নিয়োগ ভাগাভাগি করে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
এমনকি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা ভেঙে মোটা অঙ্কের লেনদেনের বিনিময়ে ‘সুইপার’ পদে হরিজন সম্প্রদায়ের কোনো সদস্যকে না নিয়ে শেখ মোহাম্মদ হাম্মাত নামে এক মুসলিম যুবককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ উক্ত জেলা পরিষদে রণজিৎ কুমার নামের এক হরিজন সুইপার বিগত পাঁচ বছর ধরে বিনা বেতনে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে দিনরাত সেবা দিয়ে আসছেন। এই নজিরবিহীন নিয়োগ বাণিজ্যে তীব্র ক্ষোভে ফুটছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় সুশীল সমাজ।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বড় ভাগটি বাগিয়ে নিয়েছেন জেলা পরিষদের সাঁটলিপিকার শেখ শফি উদ্দীন। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁর নিজের ছেলে শেখ তামিম হাসানকে ‘কম্পিউটার অপারেটর কাম মুদ্রাক্ষরিক’, ভাতিজা শেখ লোকমান হোসেন আপেলকে ‘উচ্চমান সহকারী’, আরেক ভাতিজা শেখ কাকন হোসেনকে ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ এবং ভাতিজা শেখ মোহাম্মদ হাম্মাতকে ‘সুইপার’ পদে নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু জেলা পরিষদ কার্যালয়ে নিয়োগ দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি; এর আগে তাঁর ভাগ্নে শাহীনকে শৈলকুপা ডাকবাংলোয় এবং ভাগ্নি-জামাই রাশেদকে মহেশপুর ডাকবাংলোর নৈশপ্রহরী পদে চাকরী দিয়েছেন।
একইভাবে স্বজনপ্রীতির রামরাজত্ব কায়েম করেছেন জেলা পরিষদের হিসাবরক্ষক আলমগীর হোসেন। তাঁর ভাতিজা রাব্বুল হুসাইনকে বানিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানের ‘ইলেকট্রিশিয়ান’। এছাড়া এমএলএসএস তোয়াজ উদ্দীনের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ‘ডুপ্লিকেটিং অপারেটর’, বর্তমান জেলা পরিষদ প্রশাসকের ভাই আব্দুল লতিফের ছেলে ফয়সাল আহম্মেদ নয়নকে ‘অফিস সহায়ক’ এবং কালীগঞ্জের নিয়ামতপুরের আশিকুর রহমানকে ‘জিপ চালক’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে এসব নিয়োগের পুরোটাই নিয়ন্ত্রন করেন জেলা পরিষদের সাঁটলিপিকার শেখ শফি উদ্দীন। তিনি প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে কালীগঞ্জের তিনটি ব্যাংকে টাকা জমা করেন বলে অসমর্থিত সুত্রগুলো জানায়।
নিজের ভাতিজার নিয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা পরিষদের হিসাবরক্ষক আলমগীর হোসেন ভাতিজার চাকরির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “রাব্বুল ইসলাম আমার ভাতিজা, সে সম্প্রতি চাকরি পেয়েছে। তবে নিয়োগের বিষয় নিয়ে মোবাইলে কথা না বলাই ভালো, আমি এখন স্যারের সাথে কাজে ব্যস্ত আছি।” এটুকু বলেই তিনি দ্রুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে, ছেলে, ভাতিজা, ভাগ্নে ও ভাগ্নি-জামাইসহ পুরো পরিবারকে জেলা পরিষদে পুনর্বাসনের বিষয়ে জানতে সাঁটলিপিকার শেখ শফি উদ্দীনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, “এসব আমাকে জিজ্ঞেস না করে জেলা পরিষদ প্রশাসককে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন।” এরপর তিনিও ফোন কেটে দেন।
সার্বিক জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের বিষয়ে জেলা পরিষদের নিয়োগকর্তা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা সব অনিয়ম অস্বীকার করে দাবি করেন, “নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ বিধিমালা মানা হয়েছেনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি। তবে নিয়োগপত্র ইস্যু করার পর একাধিক সদস্য যে একই পরিবারের, তা আমাকে দু-একজন জানিয়েছেন।”
সুইপার পদে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হরিজনদের বাদ দিয়ে মুসলিম যুবকের নিয়োগ সম্পর্কে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা আরো বলেন, “সুইপার পদে হরিজন সম্প্রদায়ের একজন আবেদন করেছিলেন এবং তাঁকে ইন্টারভিউয়ের চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকায় প্রথা অনুযায়ী বিকল্প হিসেবে প্রার্থী বাছাই করতে হয়েছে।”
এফপি/অ