শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে নানা আয়োজন ও প্রস্তুতি। পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে পরিকল্পনা, কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে প্রতিমা তৈরির কাজ। মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ত সময়ও শুরু হয়েছে। খড়, বাঁশ ও মাটি দিয়ে কাঠামো তৈরির পর ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমার অবয়ব। তাই তো দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উৎসবের আমেজ। আগামী ১৬ অক্টোবর দুর্গাপূজার ষষ্ঠী। তার আগে মহালয়া বা সর্বপিতৃ অমাবস্যা পালিত হবে ১০ অক্টোবর। সে দিন থেকেই দেবীপক্ষের শুরু। এই বছর দেবী ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আসবেন ও কৈলাসে ফিরবেন নৌকায়।
পূজার মূল সময়সূচি ও নির্ঘণ্ট
পঞ্জিকা অনুযায়ী ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার দিনগুলো নিচে দেওয়া হলো:
মহালয়া: ১০ অক্টোবর, শনিবার (১০ অক্টোবর ভোর থেকে দেবীপক্ষের সূচনা);
ষষ্ঠী: ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার;
সপ্তমী: ১৭ ও ১৮ অক্টোবর, শনিবার ও রবিবার (এ বছর সপ্তমী তিথি দুই দিন ধরে থাকবে);
মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজা: ১৯ অক্টোবর, সোমবার;
মহানবমী: ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার;
বিজয়া-দশমী: ২১ অক্টোবর, বুধবার।
দুর্গার আসা-যাওয়ার বাহন দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও প্রস্থানের বাহন ও তার ফলাফল নিয়ে বাঙালি সমাজে বহু কথা প্রচলিত আছে। দেবী দুর্গা ও তার পুত্র-কন্যার নিজস্ব বাহন থাকলেও আগমন ও প্রস্থানের বাহনের কথা আলাদা করে পঞ্জিকায় উল্লেখ করা থাকে। হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, দুর্গার আগমন ও প্রস্থানের বাহন নির্ধারণ করে মর্তলোকে সারা বছর কেমন কাটবে। প্রতি বছর দুর্গার আগমন ও প্রস্থান সাধারণত একই বাহনে হয় না। যদি কোনও বছর হয়‚ তবে তা খুবই অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। এই বছর দুর্গার আগমন হবে ঘোড়ায় এবং বিদায় নিবেন নৌকায়। জেনে নিন এর ফলাফল কী হবে-
দুর্গার আগমন ও গমনের হিসেব পঞ্জিকা অনুসারে পুজোর সপ্তমীতে দেবীর আগমন হয়, আর গমন হয় দশমীতে। এই দুই দিন সপ্তাহের কোন কোন বারে পড়ছে, তার উপরেই নির্ভর করে দেবীর কীসে আগমন ও কীসে গমন। শাস্ত্র অনুযায়ী সপ্তমী রবি বা সোমবার হলে দেবীর বাহন হবে গজ বা হাতি। সপ্তমী শনি বা মঙ্গলবার হলে দেবীর বাহন ঘোটক বা ঘোড়া। সপ্তমী বৃহস্পতি বা শুক্রবার হলে দেবীর বাহন দোলা বা পালকি। সপ্তমী বুধবার হলে দেবীর বাহন নৌকা। একই ভাবে, দশমী রবি বা সোমবার হলে দেবীর বাহন গজ। দশমী শনি বা মঙ্গলবার হলে দেবী বিদায় নেবেন ঘোড়ায় চড়ে। দশমী বৃহস্পতি বা শুক্রবার হলে দেবীর গমন হবে দোলা বা পালকিতে। আর দশমী বুধবার হলে নৌকা করে কৈলাসে ফিরবেন দেবী।
এ বছর দেবীর আগমন কিসে? ২০২৬-এ ২ দিন ধরে পালিত হবে সপ্তমী। ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ২০২৬ শনি ও রবিবার মিলিয়ে সপ্তমী থাকবে। তবে শাস্ত্রমতে প্রথম সপ্তমী, অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর শনিবার দেবীর আগমনের দিন হিসেবে ধরা হবে। সেই কারণে শাস্ত্রমতে এই বছর দেবীর আগমন হবে ঘোড়ায়। আবার বিজয়া দশমী পালিত হবে ২১ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার। সেই হিসেবে দেবীর ফিরে যাওয়া নৌকায়।
দেবীর বিভিন্ন বহনের তাৎপর্য শাস্ত্রমতে, গজ দেবীর উৎকৃষ্টতম বাহন। তাই দেবীর আগমন বা গমন হাতিতে হলে মর্ত্যলোক ভরে ওঠে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধিতে। পূর্ণ হয় ভক্তদের মনোবাঞ্ছা। পরিশ্রমের সুফল পায় মর্তলোকের অধিবাসীগণ। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি নয়, ঠিক যতটা প্রয়োজন ততটা বর্ষণ।
দুর্গা যদি ঘোড়ায় চড়ে আসেন বা বিদায় নেন তবে তার ফল ‘ছত্র ভঙ্গ স্তুরঙ্গমে’। অর্থাৎ সামাজিক, রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে রাজায়-রাজায় বা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ সূচিত হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে ধ্বংস ও অস্থিরতা বিরাজ করে। এক কথায় ‘ছত্রভঙ্গম’।
দেবীর আসা বা যাওয়া যদি নৌকায় হয়, তার ফল ‘শস্য বুদ্ধিস্তথাজলম’। অর্থাৎ প্রবল বন্যা ও খরা দেখা যায়। নৌকায় মনোকামনা পূর্ণ হওয়া সূচিত হয়। ধরিত্রী হয়ে ওঠে শস্য শ্যামলা। কিন্তু সেই সঙ্গে অতি বর্ষণ বা প্লাবনের আশঙ্কাও দেখা যায়।
দুর্গা যদি পালকি বা দোলায় আসেন বা ফিরে যান, তার ফল ‘দোলায়াং মকরং ভবেৎ’। অর্থাৎ মহামারী, ভূমিকম্প, খরা, যুদ্ধ ও অতিমৃত্যু লক্ষ্য করা যায়। দোলা বা পালকিতে সূচিত হয় ভয়ঙ্কর মহামারী। যাতে বিপুল প্রাণহানি অনিবার্য।
এফপি/অ