গায়ের রং, শারীরিক গঠন, পোশাক, আর্থিক অবস্থা কিংবা কথা বলার ধরন নিয়ে বিদ্রূপ—এসবকে অনেক সময় নিছক ‘মজা’ বা ‘খুনসুটি’ হিসেবে দেখা হলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আচরণ শুধু মানসিক নির্যাতন নয়; এটি ভবিষ্যতের গুরুতর অপরাধেরও প্রাথমিক ধাপ হতে পারে। তাদের মতে, বুলিংয়ের কারণে ভুক্তভোগীরা আত্মবিশ্বাস হারান, মানসিক চাপে ভোগেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, বুলিং কোনো জন্মগত আচরণ নয়; বরং পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক শিক্ষা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সহমর্মিতার অভাব থেকে এ ধরনের আচরণের জন্ম হয়। অনেক ক্ষেত্রে যারা নিজেরাই অবহেলা, সহিংসতা বা মানসিক চাপে বেড়ে ওঠে, তারা অন্যকে অপমান বা হেয় করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।
অপরাধবিজ্ঞানের সোশাল লার্নিং থিওরি অনুযায়ী, মানুষ তার আশপাশের পরিবেশ থেকেই আচরণ শেখে। ফলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল বা অনলাইন মাধ্যমে বুলিংয়ের ঘটনা ঘটার পরও যদি তা উপেক্ষিত হয়, তবে তা অন্যদের কাছেও গ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে স্ট্রেইন থিওরি দীর্ঘদিনের অপমান, মানসিক চাপ ও সামাজিক প্রত্যাখ্যানের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে, যা কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল, বডি শেমিং, কটূক্তি এবং সাইবার বুলিংয়ের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মসম্মানবোধের সংকট এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যায় পড়তে পারেন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, বুলিংয়ের শিকার অনেকেই লজ্জা, ভয় বা সামাজিক চাপে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেন না। ফলে অধিকাংশ ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যায় এবং অপরাধীরা উৎসাহিত হয়।
বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাগিং ও বুলিং প্রতিরোধে বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত, র্যাগিংবিরোধী কার্যক্রম জোরদার এবং শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া বুলিং প্রতিরোধ সম্ভব নয়। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর কাউন্সেলিং ব্যবস্থা, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ প্রক্রিয়া এবং বুলিংবিরোধী নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, একটি কটু মন্তব্য বা বিদ্রূপ হয়তো উচ্চারণ করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে, কিন্তু তার মানসিক ক্ষত একজন মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে বহন করতে হতে পারে। তাই বুলিংকে তুচ্ছ ঘটনা হিসেবে না দেখে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার এখনই সময়।
এফপি/ফ