জামালপুরের মাদারগঞ্জে সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ও স্টাফদের চিকিৎসা অবহেলায় সাপের কামড়ে আহত এক নারীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিহতের স্বজনরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত রমিছা বেগম (৫৫) বালিজুড়ী ইউনিয়নের মধ্য তারতাপাড়া গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী চান মিয়ার স্ত্রী।
নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার (৬ জুলাই) রাত ৯টার দিকে বাড়ির উঠানে একটি বিষধর সাপ রমিছা বেগমের পায়ে কামড় দেয়। পরে স্বজনরা তাকে দ্রুত মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
স্বজনদের অভিযোগ, ওই সময় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাহিদুজ্জামান উশ্নু ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দিতে ৪ তলায় ছিলেন। জরুরি বিভাগে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আছাদুজ্জামান ও নৈশপ্রহরী মুসলিম উদ্দিন দায়িত্বে ছিলেন। তারা সাপে কাটা ওই নারীর রক্ত পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় চিকিৎসায় অবহেলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন নিহতের স্বজনরা।
এরপর জরুরি বিভাগে থাকা চিকিৎসক ডা. নাহিদুজ্জামান এলে সাপে কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে ততক্ষণে রোগীর অবস্থার অবনতি হওয়ায় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে রমিছা বেগমের পরিবারের সদস্যরা বিকল্প চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তাকে জরুরি বিভাগ থেকে নিয়ে যান।
পরে স্থানীয়দের পরামর্শে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের জন্য আবারও রমিছা বেগমকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এ সময় রোগীর অবস্থার অবনতি দেখে চিকিৎসক ডা. নাহিদুজ্জামান তাকে জামালপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করেন। তবে পরিবারের সদস্যরা মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনার জেরে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুর ১২টার দিকে নিহত রমিছা বেগমের ভাই শরিফ উদ্দিন কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে আসেন। এ সময় উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আছাদুজ্জামানের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে শরিফ উদ্দিন তার ওপর শারীরিক হামলা চালান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
নিহতের ছেলে লিটন মিয়া বলেন, “আমার মাকে সাপে কামড় দেওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে যাই। ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা করে বলেন, এটি সাপের কামড় নয়, চিকা বা অন্য কিছু কামড় দিয়েছে। কোনো অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি। পরে মায়ের অবস্থা খারাপ হলে আবার হাসপাতালে নিয়ে গেলে জামালপুরে পাঠানো হয়। কিন্তু পথে আমার মা মারা যান। চিকিৎসকের অবহেলার কারণেই আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাহিদুজ্জামান বলেন, “সাপে কাটা রোগী এলে আমরা সরকারি চিকিৎসা প্রোটোকল অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। রক্ত পরীক্ষার পাশাপাশি বিষধর সাপের কামড়ের বিভিন্ন লক্ষণ, যেমন চোখে ঝাপসা দেখা, ঘাড় বেঁকে যাওয়া ও অন্যান্য স্নায়বিক উপসর্গ পরীক্ষা করা হয়। ওই রোগীর মধ্যে এসব লক্ষণ পাওয়া যায়নি। তাই তখন অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়।”
মাদারগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি জানিয়েছেন, রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়েছিল। অ্যান্টিভেনম দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও রোগীর স্বজনরা তাকে নিয়ে চলে যান। পরে আবার হাসপাতালে নিয়ে এলে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আজ দুপুরে নিহতের স্বজনরা এসে কর্তব্যরত চিকিৎসকের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় বলেন, “ঘটনার বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। কোনো পক্ষ থেকে এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এফপি/র