মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফের শুরু হওয়া সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করছে। দিন-রাত থেমে থেমে গোলা-গুলিতে বিস্ফোরণে কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তসংলগ্ন এলাকাবাসী আতংকগ্রস্ত হয়ে দিন কাটাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রাখাইনে অবস্থান করা রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে ফের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে, স্থল ও জল সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ড সতর্ক অবস্থানে থেকে টহল দিচ্ছে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) মংডু শহরের ভেতরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও সীমান্তের এপারে তেমন কোনো বিকট শব্দ শোনা যায়নি।
সূত্র মতে, চলতি মাসের প্রথম দিন থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাখাইন রাজ্য পুনরুদ্ধারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করে। বুধ ও বৃহস্পতিবার রাত-দিন-সন্ধ্যা থেমে থেমে হামলা চালানো হয়। বিমান হামলায় ফেলা গোলাবারুদের বিস্ফোরণের তীব্রতায় কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের বাড়িঘরসহ বিভিন্ন গ্রাম ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তে বসবাসরত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকজন সচেতন বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় সেখানে বসবাসকারী রোহিঙ্গারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সেখানে থাকা নিরাপদ বোধ না করলে তারা এপারে চলে আসতে পারে। এখানে থাকা স্বজনদের সাথে অনেকে যোগাযোগ করছেন।
হ্নীলার আলীখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, বুধ ও বৃহস্পতিবার মংডু শহরে আরাকান আর্মির দখলে থাকা শহর ও গ্রাম পুনরুদ্ধারে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে। এ সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আরাকান আর্মির সদস্যদের মকো রোহিঙ্গা মুসলিমরাও সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জেনেছি।
আরেক বাসিন্দা ইদ্রিস মিয়া বলেন, মংডুতে থাকা আমার এক আত্মীয়ের সাথে যোগাযোগ করে জেনেছি, সেখানকার পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। সহজে কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। অনেক রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।
তিনি আরও বলেন, গত এক বছর আগে সংঘাতের সময় ধাপে ধাপে উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছিলেন। আমরা চাই, মিয়ানমারের রাখাইনে থাকা আমাদের রোহিঙ্গা ভাইয়েরা যেন নিরাপদে থাকতে পারেন।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ওপারে সংঘাত মানে এপারে আতংক। সীমান্তবর্তী গ্রামের বাড়িঘরে গোলাবারুদ এসে পড়ার ভয়, পাশাপাশি মিয়ানমার নাগরিকদের পারে অনুপ্রবেশের শঙ্কা। আরাকান আর্মি-মিয়ানমার সরকারের সংঘাত শুরুর পর ইতোমধ্যে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছিল। ফের শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে অবশিষ্ট থাকা রোহিঙ্গারা এপারে চলে আসার শংকা দেখা দিয়েছে।
শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তের খুব কাছেই মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্ত। বলা যায়, এখান থেকে আরাকান আর্মির পোস্টও দেখা যায়। গত বুধবার শাহপরীর দ্বীপের ওপারে রাখাইনে বিমান হামলার বিস্ফোরণের তীব্রতায় আমাদের বাড়িঘর ভূমিকম্পের মতো কেঁপে উঠেছিল। আমরা ভীষণ ভয় ও আতঙ্কে ছিলাম।
হোয়াইক্যং সীমান্তের বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘাত শুরু হলেই আমাদের মাঝে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তের কাছে বাস, তাই যেকোনো সংঘাতের প্রভাব সরাসরি আমাদের ওপর পড়ে।
পালংখালী সীমান্তের কৌশিক সিকদার বলেন, গত এক বছর আগে সংঘাতের সময় ওপারে ছোড়া গুলি সীমান্তের একাধিক গ্রামের বাড়ির চালাসহ বিভিন্ন অংশে আঘাত হানে। তখন পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কেটেছে সকলের। এখন আবার সংঘাতের খবর শুনেই পুরোনো আতংক ছড়িয়ে পড়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, সীমান্তবাসীদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে। টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়া, বরইতলী ও জাদিমোড়া সীমান্ত এলাকায় বিশেষ টহল, নাফ নদীতে নৌ টহল এবং পুরো সীমান্তজুড়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রশাসনের সবসেক্টর নিয়মিত পরিস্থিতি জানাচ্ছেন। অনুপ্রবেশ বা অন্য যেকোন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। সীমান্ত শতভাগ সুরক্ষিত, তবে সবার নিজ নিজ অবস্থান থেকে সতর্ক থাকা জরুরী বলে উল্লেখ করেন ডিসি।
এফপি/অ