দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরকে অপরাধমুক্ত করতে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, জঙ্গল সলিমপুরে আর কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কিংবা অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্য থাকতে দেওয়া হবে না। রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো অপশক্তি টিকে থাকতে পারবে না।
রোববার জঙ্গল সলিমপুর এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। পরিদর্শনকালে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডাঃ শাহাদাত হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বিজিবির মহাপরিচালক, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, সিএমপি কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিগত বছরগুলোতে অপরাধী চক্রগুলো জঙ্গল সলিমপুরে নিজেদের একটি সমান্তরাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সিসিটিভি ক্যামেরা, পাহারা ব্যবস্থা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করত। তবে সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত যৌথ অভিযানের ফলে সেই নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রামে কিছু সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে নজরে আসে। ব্যবসায়ীদের বাসভবনে হামলা, গুলি বর্ষণ, চাঁদাবাজি এবং আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ মার্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি বড় ধরনের যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
মন্ত্রী জানান, অভিযানে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁসের কারণে মূল হোতাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তথ্য ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদেরও খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
র্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “যারা এই ঘটনার পেছনে রয়েছে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ভূমিদস্যু, অর্থদাতা এবং মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার কোনো সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়। বিভিন্ন কারণে যারা এলাকায় বসতি স্থাপন করেছেন, তাদের কাউকে আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না। প্রকৃত বাসিন্দাদের জন্য একটি টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে গুজব বা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
এলাকার উন্নয়নের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরকে একটি আধুনিক ও নিরাপদ জনপদে রূপান্তর করতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। সলিমপুর ইউনিয়নের সঙ্গে সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোড এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বায়েজিদ লিংক এলাকার খাস জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরের দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুধু জঙ্গল সলিমপুর নয়, চট্টগ্রামের বেতুয়া, চা বাগানসহ অপরাধপ্রবণ অন্যান্য এলাকাতেও সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একই ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অপরাধীদের জন্য কোনো ছাড় নেই এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।
তিনি গণমাধ্যমকর্মী, স্থানীয় জনগণ এবং প্রশাসনের সম্মিলিত সহযোগিতা কামনা করে বলেন, “জনগণকে সঙ্গে নিয়েই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। একটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”
এফপি/অ