তাহিরপুরে নামমাত্র মূল্যে গরুর হাট ইজারা ঈদ-উল-আযহায় পশু কেনা-বেচা সহজ ও স্বাচ্ছ্যন্দময় করতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় ৪টি অস্থায়ী পশুর হাট স্থাপন করা হয়েছে।
হাটগুলো হচ্ছে- লাউড়েরগড়, কলাগাঁও, একতাবাজার ও শান্তিপুর। হঠাৎ করেই গত শুক্রবার বড়ছড়া বাজারে আরেকটি অবৈধ পশুর হাট বসিয়ে পশু কেনা-বেচা ও ইজারা আদায় শুরু করেছে আরেকটি পক্ষ। সবগুলো পশুর হাটই ভারত সীমান্তঘেঁষে অবস্থিত। অভিযোগ উঠেছে এ সকল পশুর হাট নামমাত্র মূল্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে। পশুর হাটের ইজারার বিষয়টি না জানায় ইচ্ছুক অনেকেই ইজারায় অংশ নিতে পারেননি। কিন্তু গত দুই তিন দিন থেকে সরকারের নির্ধারিত হারে ইজারা আদায়ের চেয়ে উচ্চ হারে গরু প্রতি ১৫শত টাকা থেকে ২ হাজার টাকা ইজারা আদায় হচ্ছে। একটি বাজারেও ইজারা আদায়ের দৃশ্যমান কোনো সাইনবোর্ড বা তালিকা নেই।
কোরাবানির পশু কেনা বেচাকে কেন্দ্র করে এমন অনিয়মের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। এসব নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ গত ৩ মে সচিবালয়ে তাঁর সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে এবং দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় এবার সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট ইজারা দেওয়া হবে না। তবে মন্ত্রীর এই ঘোষণা শুধু ঘোষণা হিসেবেই থাকছে। সুনামগঞ্জে সেটা কার্যকরের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। উপজেলার ছিলানী তাহিরপুর গ্রামের আব্দুল আলীম বলেন, কলাগাঁও হাটে গতবছর যেখানে প্রতি গরু ৪০০ টাকা আসিল নিতো। এইবার প্রতি গরুতে আসিল নিচ্ছে ২ হাজার টাকা। ইউএনও এইবার হাট ইজারা দিয়ে তাদের চাঁদাবাজি করার সুযোগ করে দিছে। এমনকি তারা হাটে গরু কত টাকায় কিনা হইছে রশিদে তা লেখলেও রশিদে আসিলে ( ইজারা) কত রাখছে তা লেখেনা। গতকাল (শনিবার) এই হাটে কমপক্ষে ২০০ গরু বেচা কিনা হইছে। ভাই আমরা এ-ই দেশের জনগণ বলির পাটা। সরকারের নেতাকর্মীদের একটা পথ করে দিব আর হেরা আমরারে ইচ্ছামত জব করবো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার লাউড়েরগড় পশুর হাটটি ১৮ হাজার টাকায় সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের একান্ত মোটরসাইকেল ড্রাইভার তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের উজান তাহিরপুর গ্রামের বিএনপি নেতা সোহানুর রহমান সোহাগ, একতা বাজার পশুর হাটটি ২০ হাজার টাকায় দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মানিক ডাক্তার, কলাগাঁও বাজার পশুর হাটটি ২৮ হাজার টাকা জেলা যুবদল নেতা কামড়াবন্দ গ্রামের আজিজুর রহমান ও শান্তিপুর পশুর হাটটি ৪৮ হাজার ১০০ টাকায় ইজারা পান উত্তর বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদকশান্তিপুর গ্রামের মজিবুর রহমান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান উপজেলা প্রশাসন কোনো ধরণের প্রচারণা ছাড়াই অস্থায়ী হাটগুলো ইজারা দিয়েছে নামমাত্র মূল্যে। সবগুলো পশুর হাটই উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা ইজারা পেয়েছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ সরকার দলীয় একটি পক্ষকে সুবিধা দিতেই এমন লুকোচুরি হয়েছে পশুর হাট ইজারায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসনের দেয়া চারটি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারায় রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। এবং কোনধরনের বিজ্ঞপ্তি বা প্রচারণা ছাড়াই গোপনে কম টাকায় চার বিএনপি নেতাকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার যোগসাজশে চারটি হাটের ন্যায্য মূল্যের চেয়ে অধিক কম মূল্যে দিয়ে চারটি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দেয়ায় সরকার কয়েক লাখ টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৮ লাখ টাকার চারটি অস্থায়ী পশুর হাট নামমাত্র ১ লাখ ১৪ হাজার ১০০ টাকায় ইজারা দেয়া হয়।
কলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মোশের্দ আলম বলেন, এটা হাট না, যেন রাজস্ব লুটের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। উপজেলার সবকয়টি গরুর হাটকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে, যারা সম্প্রতি সময়ে ওই হাটের রাজস্ব আদায়কে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, ‘হাটে গরু ওঠানামা, বেচাকেনা, ইজারা আদায় সবকিছুই একটা রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক বড় অঙ্কের টাকা হাতবদল হচ্ছে, কিন্তু সরকারি রসিদে দেখা যায় নামে মাত্র। সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
এ বিষয়ে কলাগাঁও বাজার অস্থায়ী পশুর হাট ইজারাদার আজিজুর রহমান বলেন, আমরা নিয়ম অনুযায়ী হাট ডাকে এনেছি। এখানে কোন রাজনৈতিক প্রভাব বা সিন্ডিকেট হয়নাই। আর অতিরিক্ত ইজারা আদায়ের যে অভিযোগ উঠেছে তা মিথ্যা। সরকারের নির্ধারিত হারেই ইজারা আদায় করছি।
এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা নবাগত নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক বলেন, অস্থায়ী পশুর হাট গুলো ইজারা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই ইজারা দেয়া হয়েছে। ইজারা বিজ্ঞপ্তি কেউ জানেনা এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, এগুলো দেয়ার অনুমতি পাওয়ার পরেই একদিনের মৌখিক প্রচারের মাধ্যমে ইজারা দেয়া হয়েছে। প্রচারের মাধ্যমেই অস্থায়ী পশুর হাট গুলো ইজারা দেয়া হয়েছে। এগুলো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়ার কোন সুযোগ থাকেনা বলে ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে ফোন দিলেও রিসিভ না করার উনার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে চারটি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা মূল্যের চেয়ে অতি কম মূল্যে ইজারা দেয়া হয়েছে জানতে চেয়ে ট্যাক্স পাঠানোর পরও কোন ফিরতি উত্তর পাওয়া যায়নি।
এফপি/জেএস