বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর করলিয়ামুরার শতবর্ষী একটি গ্রামীণ সড়ক যেন এখন এলাকাবাসীর দীর্ঘশ্বাস আর অবহেলার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও সড়কটি পাকা তো দূরের কথা, সামান্য ইটের সলিংও হয়নি। ফলে বছরের অধিকাংশ সময় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে হাজারো মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে।
রবিবার (১০ মে) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উত্তর করলিয়ামুরা বটতলী বাজার থেকে ঘোনাপাড়া পর্যন্ত দীর্ঘ এই সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও ভাঙা রাস্তা, আবার কোথাও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সড়কের অংশ ধসে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো সড়ক কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। তখন এ পথ দিয়ে হেঁটে চলাও হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় একশ বছরের পুরনো এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন পাঁচ গ্রামের হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। এর মধ্যে রয়েছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রোগী, নারী, বৃদ্ধ, কৃষক, শ্রমজীবী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সংস্কারের অভাবে সড়কটি এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যম করলিয়ামুরা থেকে ঘোনাপাড়া পর্যন্ত পাহাড়ি অংশে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানিতে সৃষ্টি হয়েছে গভীর খাদ ও বড় বড় গর্ত। বর্ষাকালে এ অংশে প্রায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষিপণ্য ও রাবার বাগানের কষ পরিবহনে ভারী ডাম্পার চলাচলের কারণে সড়কের বেহাল দশা আরও প্রকট হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ সড়ক পাড়ি দিয়ে বাইশারী উচ্চ বিদ্যালয়, বাইশারী শাহ নুরুদ্দীন দাখিল মাদ্রাসা, বাইশারী মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, দক্ষিণ করলিয়ামুরা ত্বালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (র.) মাদ্রাসা ও ঈদগড় উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছে।
বর্ষা এলেই দুর্ভোগ যেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কাদায় পড়ে আহত হওয়া, রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে না পারা, শিক্ষার্থীদের স্কুলে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগা—এসব যেন এলাকাবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা।
বাইশারী ও ঈদগড় উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. রিমন ও তানিয়া বলেন, “বর্ষাকালে এই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় কাদায় পড়ে যাই। জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়। বই-খাতাও ভিজে যায়। রাস্তার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে যেতে চায় না।”
উত্তর করলিয়ামুরা আসদ আলী কারবারি পাড়ার সমাজপতি (সদ্দার) মো. শাহ আলম ও মো. ছৈয়দ আলম কারবারি বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে এই রাস্তার কষ্ট ভোগ করছি। জনপ্রতিনিধিরা ভোটের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। বর্ষাকালে মানুষ একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অসুস্থ রোগী নিয়ে বের হওয়াও কঠিন হয়ে যায়।”
করলিয়ামুরার বাসিন্দা ও সাবেক ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “এই রাস্তা শুধু একটি রাস্তা না, এটি পাঁচ গ্রামের মানুষের জীবনরেখা। অথচ বছরের পর বছর ধরে অবহেলায় পড়ে আছে। জনগণের দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই। দ্রুত সড়কটি পাকা করা না হলে আগামী বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।”
ঘোনাপাড়ার সমাজপতি (সদ্দার) মো. আব্দুস ছালাম বলেন, “একশ বছরের পুরনো রাস্তা এখনও কাঁচা থাকবে এটা দুঃখজনক। আমাদের একটাই দাবি—রাস্তা দ্রুত পাকা অথবা ইটের সলিং করে মানুষের চলাচলের উপযোগী করা হোক।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রুবেল, নুরুল আলম, ছৈয়দ করিম, বেদার মিয়া, আজগর আলী ও কামাল উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন বলেন, “শুধু আশ্বাস শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত। নির্বাচন এলে রাস্তার কথা সবাই বলে, কিন্তু পরে আর কেউ খোঁজ নেয় না। আমরা এখন আর প্রতিশ্রুতি চাই না, কাজ দেখতে চাই।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আনোয়ার সাদেক বলেন, “একটি এনজিও প্রকল্পের মাধ্যমে সড়কটির কাজ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে কী অবস্থায় আছে তা নিশ্চিত নই। তবে এলাকাবাসীর দুর্ভোগের বিষয়টি আমি অবগত আছি।”
বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম (কোম্পানি) বলেন, “বর্ষাকালে গ্রামীণ সড়কে কিছুটা ভোগান্তি হওয়া স্বাভাবিক। তারপরও বিষয়টি আমার নজরে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
স্থানীয়দের ভাষায়, “এই রাস্তা শুধু মাটির রাস্তা নয়, এটি পাঁচ গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার পথ।” কিন্তু সেই পথ আজ কাদা, গর্ত আর অবহেলার ভারে জর্জরিত। একশ বছরের পুরনো এই সড়ক কবে পাবে উন্নয়নের ছোঁয়া—সেই প্রশ্নই এখন উত্তর করলিয়ামুরা থেকে ঘোনাপাড়ার মানুষের মুখে মুখে।
এফপি/অ