দিগন্তজোড়া সোনালি বোরোধান—যেন প্রকৃতির আঁকা এক অপার সৌন্দর্য। কিন্তু সেই স্বপ্নভূমিতেই হঠাৎ আছড়ে পড়েছে বৈরী আবহাওয়া, বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর নির্মম থাবা। একদিকে পাকা ধানের মায়াবী আভা, অন্যদিকে ঝড়-বৃষ্টিতে লণ্ডভণ্ড মাঠ—দুটি দৃশ্য এখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যেন এক করুণ বাস্তবতার গল্প বলছে।
রোববার (৩ মে) সরেজমিনে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী, ঘুমধুম, দৌছড়ি ও সদর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠ ঘুরে দেখা যায়—যেখানে কিছুদিন আগেও সোনালি শীষে ভরে উঠেছিল কৃষকের স্বপ্ন, সেখানে এখন অনেক জমিতে ধানগাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। কোথাও কোমরভাঙা হয়ে শুয়ে আছে ধান, আবার কোথাও পানিতে ডুবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে শেষ আশায়।
চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের প্রত্যাশায় উচ্ছ্বসিত ছিলেন কৃষকরা। কিন্তু কয়েকদিনের টানা কালবৈশাখী ঝড়, বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া সেই আশায় টান দিয়েছে অনিশ্চয়তার কালো রেখা। অনেক মাঠে কাটা ধান পড়ে আছে পানিতে, যা ঘরে তুলতে না পেরে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা।
বাইশারী ইউনিয়নের উত্তর করলিয়ামুরা গ্রামের কৃষক মো. ছৈয়দ আলম কারবারী কণ্ঠে হতাশার সুর তুলে বলেন, “ধান পেকে গেছে, কিন্তু কাটতে পারতেছি না। বৃষ্টি আর কাদায় সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। কাটা ধান পানিতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। শেষ বেলায় এসে খুব চিন্তায় আছি।”
একই গ্রামের কৃষক মো. নুরুল আলমের চোখে যেন অসহায়তার ছাপ, তিনি বলেন, “কষ্ট করে ফলাইছি, এখন চোখের সামনে ভিজে নষ্ট হইতেছে। মাঠে কাটা ধানের গোছা পড়ে আছে, তুলতে পারতেছি না। মনে খুব কষ্ট লাগে—জানিনা কপালে কি আছে।”
ঘুমধুম ইউনিয়নের কৃষক মো. ছালাম আরও শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যে ধানগুলোতে থোড় আসছিল, সব শেষ। বৃষ্টিতে ডুবে গেছে, বাতাসে পড়ে গেছে। এগুলো আর ঠিকমতো ধান ধরবে না।”
সদর ইউনিয়নের কৃষক মো. ছৈয়দ হোছাইন ক্ষোভের সাথে বলেন, “ধান কাটার সময়ও হয়নি, এরই মধ্যে ঝড় এসে সব নষ্ট করে দিল। আরেকটু বৃষ্টি হলে পুরো ফসলই শেষ হয়ে যাবে।”
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে নাইক্ষ্যংছড়ির ১৫টি কৃষি ব্লকে মোট ১ হাজার ২৩৯ হেক্টর জমিতে বোরোধান চাষ হয়েছে, যা স্থানীয় হিসাবে প্রায় ৭ হাজার ৬৫০ কানির সমান।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, কিছু জমিতে ধান পাকা শুরু হলেও অধিকাংশ ক্ষেতেই ধান রয়েছে থোড় বা আধাপাকা অবস্থায়। এই সময়ের ঝড়-বৃষ্টি ধানের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
একজন কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই সময়ের কালবৈশাখী ধানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশেষ করে থোড় ও আধাপাকা ধান বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। দ্রুত আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে ফলনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।”
মাঠে পড়ে থাকা ধান এখন যেন এক অনিশ্চয়তার চিত্র। কৃষকের চোখে স্বপ্ন নয়, ভেসে উঠছে শঙ্কা আর হতাশা। যে মাঠে কিছুদিন আগেও ছিল সোনালি হাসি, আজ সেখানে ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন। প্রশ্ন এখন একটাই—এই সোনালি ধান কি ঘরে উঠবে, নাকি বৈরী আবহাওয়ার ঢেউয়ে ভেসে যাবে কৃষকের সব স্বপ্ন।
এফপি/অ