প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশে বন্ধ থাকা সব কারখানা চালু করা হবে। বন্ধ থাকা কল-কারখানা চালু হলে বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হবে। যেসব দেশে শ্রম বাজার বন্ধ রয়েছে, সেগুলোও আমরা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। অতিদ্রুত সেসব দেশে জনশক্তি রফতানি শুরু হবে।
আজ শনিবার (২ মে) দুপুরে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া নদী পুনঃখনন কাজ উদ্বোধন শেষে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
দেশে বন্ধ থাকা সব কারখানা চালু করার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘সরকার গঠনের ৫-৭ দিনের মধ্যে আপনাদের সন্তান মুক্তাদিরকে (শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির) নিয়ে আমি বসেছিলাম। তাকে বলেছিলাম, কোথায় কোথায় বন্ধ কল-কারখানা আছে তা বের করেন। বন্ধের কারণ বের করেন। সবগুলো আমরা ধীরে ধীরে চালু করবো। যাতে আমাদের দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হয়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের ভেতরে যারা শিল্প উদ্যোক্তা আছেন, তাদের নিয়ে আমরা বসেছি। যাতে তারা নতুন নতুন কারখানা তৈরি করতে পারেন। এতে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবেন। শুধু তাই নয়, যেসব দেশের শ্রম বাজার বন্ধ আছে সেগুলোও আমরা চালু করার ব্যবস্থা করছি। অতিদ্রুতই সেসব দেশে মানুষ যাওয়া আবার শুরু হবে।’
বিএনপি সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, সারাদেশে খাল খনন কার্যক্রম শুরু করবো। আমরা শুরু করেছি। আজ এই বাসিয়া খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করলাম। এই খাল খনন শেষে দুই পাড়ে আমরা ৫০ হাজার গাছ লাগাবো। সেখানে স্থানীয়রা প্রকৃতির সান্নিধ্য পাবেন। বাসিয়া পুনঃখনন শেষ হলে সরাসরি ৮০ হাজার কৃষক উপকৃত হবে। আর পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে আরও অন্তত দেড় লাখ মানুষ। এতে বছরে আরও ৭ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে।’
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছি। কৃষকদের কৃষি কার্ড দেওয়ার কাজও শুরু করেছি। এই কার্ড দিয়ে তারা যেমন সার কীটনাশক বীজ পাবেন, তেমনি কৃষি ঋণও পাবেন। ইতোমধ্যে আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করেছি। ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের আমরা ভাতা দেওয়া শুরু করেছি।’
এর আগে সিলেটে এসে নগরের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি মেঘাপ্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর নগর ভবনে সুধি সমাবেশে বক্তব্য দেন তিনি।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করতে আমি যখন সিলেট এসেছিলাম তখন বলেছিলাম, সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ সিলেট থেকে বাইরোডে ঢাকা যেতে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই আমি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের উন্নয়নের কথা বলেছিলাম। সরকার গঠনের পর আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক সম্প্রসারণ কাজে জমি অধিগ্রহণে ১১ টি জায়গায় সমস্যা ছিল। এজন্য কাজ আটকে ছিল। এই সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে দূর করা হয়েছে।’
কেবল সড়কপথ নয়, সরকার রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগও নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ঢাকা-সিলেট রেলপথকে ডাবল লাইন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’
সিলেটে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ২০০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালু করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এছাড়া সিলেট হাসপাতালকে (ওসমানী হাসপাতাল) আমরা ১২শ’ শয্যায় উন্নীতের চেষ্টা করবো।
তিনি বলেন, কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়, আমাদের মতো দেশগুলোকে রোগ প্রতিরোধেও সচেতন হওয়া দরকার। এজন্য আমরা ১ লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ করবো। যাদের ৮০ ভাগই হবেন নারী। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা গ্রামে গ্রামে মানুষের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করবেন। কোন খাবার বেশি খেলে কোন রোগ হয় এসব ব্যাপারে অবগত করবেন।
বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এগুলো চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি। দরকার হলে প্রাইভেট খাতে ছেড়ে দিয়ে চালু করতে চাই। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টেরও চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, সিলেটে একটি আইটি পার্ক আছে। কিন্তু এটি সচল নেই। আমরা এটি দ্রুত সচল করার চেষ্টা করছি। যাতে তরুণরা এখানে কাজের সুযোগ পায়। ভোকেশনাল সেন্টারগুলো আপডেট করারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এয়ারপোর্ট থেকে আসার সময় দেখছিলাম, বৃষ্টির কারণে পানি জমে গেছে। বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জের অনেক কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। এছাড়া সব নগরেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি ধীরে ধীরে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমরা খাল খনন কর্মসূচী নিয়েছি। তাতে বৃষ্টির পানি আমরা ব্যবহার করতে পারবো। জলাবদ্ধতাও নিরসন হবে।
নদী ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়ে প্রধান বলেন, নদীতে প্লাস্টিকের স্তর জমে পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এই বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় স্কুলগুলোতে উদ্যোগ নিয়ে শিশুদের পরিবেশের বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, হুইপ জিকে গউছ ও সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার।
নতুন কুঁড়ি স্পোটর্স-এর উদ্বোধন: বিকেলে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় শিশু-কিশোরদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘তোমরা প্রত্যকে বাংলাদেশের একেকজন এম্বাসেডর হবে। তোমরা স্পোর্টসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পৃথিবীর কাছে তুলে ধরবে। তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যত। তোমাদেরকে বাংলাদেশের দায়িত্ব নিতে হবে।’
শিশু কিশোরদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের সামর্থ্য দিয়ে ছোট্টবন্ধুদের পাশে আছি। তা হোক লেখাপড়া বা খেলাধুলার। তোমরা যারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, খেলোয়াড়, গায়ক, মিউজিশিয়ান- যে যা হতে চাও, সরকার তোমাদের সহযোগীতা কর। যে গান শিখতে চায়, সে গান শিখবে, যে মিউজিশিয়ান হতে চায়, সে মিউজিশিয়ান হবে, সেই ব্যবস্থা আমরা করবো।’
অনুষ্ঠানে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই কর্মসূচির আওতায় ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোররা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, দাবা, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট- এই ৮টি খেলাকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। পুরো প্রতিযোগিতাকে প্রশাসনিকভাবে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে: ঢাকা, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ। একজন প্রতিযোগী সর্বোচ্চ দুটি ইভেন্টে অংশ নিতে পারবে। ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি ও ব্যাডমিন্টন হবে নকআউট পদ্ধতিতে। দাবা প্রতিযোগিতা হবে সুইস-লিগ পদ্ধতিতে।
অন্যদিকে, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার ও মার্শাল আর্টে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১৩ থেকে ২২ মে’র মধ্যে আঞ্চলিক পর্যায়ের সব কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু হয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে জাতীয় পর্যায়ের সেরা খেলোয়াড়দের নির্বাচন করা হবে।
এফপি/জেএস