বদলি আদেশ থাকলেও তা উপেক্ষা করা, কর্মস্থলে এক বছর অনুপস্থিত থাকা এবং সম্প্রতি ঘুষ গ্রহণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরও স্বপদেই বহাল রয়েছেন মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমান।
একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর এমন প্রভাব ও দাপট নিয়ে জেলাজুড়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে এই কার্যালয়ে যোগদানের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে মিজানুর রহমান এখানে খুঁটি গেড়ে বসে আছেন। কয়েক দফায় পিরোজপুর ও মাদারীপুরে বদলি করা হলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ও উচ্চ আদালতে রিট করে তিনি বারবার মুন্সীগঞ্জে ফিরে আসেন।
অতি সম্প্রতি মিজানুর রহমানের ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও রেকর্ড ফাঁস হয়। ৪২ সেকেন্ডের সেই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায় কত আনছেন তখন অপরপক্ষ বলেন ৫০ আনছি স্যার।মিজানুর রহমান বলেন আমিতো ৭০ আনতে বলছি। ৫০ হবে না। না স্যার আপাতত ৫০ নিতে বলছে। মিজানুর রহমান বলেন ও আচ্ছা, ঠিক আছে।পরে তাকে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা গ্রহণ করতে দেখা যায়। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ওমরাহ পালনের জন্য ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে সৌদি আরব যান মিজানুর। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকে ফেরার পথে স্বর্ণ ও রিয়ালসহ সৌদি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে প্রায় দুই মাস কারাবাস খাটেন তিনি। ফলে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে মিজানের ক্ষমতার দাপট আরও বেড়ে যায়। এবং দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় স্থানীয় দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন মিজানুর রহমান। মামলাটি করা হয়েছে দৈনিক মুন্সীগঞ্জের সময় পত্রিকার সম্পাদক মো. মঈনউদ্দিন আহমেদ সুমন ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের জেলা প্রতিনিধি আবুসাঈদ দেওয়ান সৌরভের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জেলার গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, অনিয়ম, দূর্নীতি ও ঘুষ কান্ডের পরও যদি একজন তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারী রোষানলে পড়ে সাংবাদিকদের মামলার কারণে হয়রানি হতে হয় এটা দেশ ও জাতির জন্য লজ্জার। সচেতন মহলের দাবী আর কত দূর্নীতি ও অনিয়ম হলে একজন মিজানুর রহমান শাস্তির আওতায় আসবে। নাকি তার কৌশলি মামলায় পড়ার ভয়ে সাংবাদিকরা সত্য প্রচারে পিছিয়ে যাবে। সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ তাহলে কি শুধু নিরব হয়ে তাকিয়ে দেখবে।
যুগান্তর পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার আরিফ উল ইসলাম বলেন, ঘুষের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও একজন কর্মচারী স্বপদে বহাল থাকে কীভাবে? উল্টো তিনি সাংবাদিকদের হয়রানি করছেন। এর দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
প্রথম আলো পত্রিকার মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি ফয়সাল আহমেদ বলেন, নানা অনিয়ম ও ঘুষ কান্ডে ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। যদি কেউ এমন অপরাধের পরও কেউ ছাড় পায়, তাহলে এমন অপরাধ বাড়তেই থাকবে। আমরা সব সময় আমাদের সহকর্মীদের পক্ষে আছি। সকল অসৎ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আর টিভির মুন্সীগঞ্জ পশ্চিম প্রতিনিধি হামিদুল ইসলাম লিংকন বলেন, এতো স্বচ্ছ প্রমাণ থাকার পরও কিভাবে একজন ঘুষ গ্রহণকারী কর্মচারী স্বপদে বহাল থাকে। এই কর্মচারী শত অনিয়মের পর স্বপদে বহাল থাকে। তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এদিকে টাকার উৎস সম্পর্কে স্থানীয় সাংবাদিকরা জানতে চাইলে অভিযুক্ত মিজানুর রহমান বলেন, এটি তার বাড়ি ও দোকান ভাড়ার টাকা। তবে পরবর্তীতে একই বিষয়ে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি ভিন্ন দাবি করেন। তিনি বলেন, টাকা তার এক ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকের। এভাবে একই বিষয়ে তার দুই ধরনের বক্তব্যেও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্টেনোটাইপিস্ট মো: মিজানুর রহমান বলেন, জেলার কোঠায় চাকুরী পেয়ে মুন্সীগঞ্জে কর্মরত আছি। তবুও আড়াই বছর ঢাকায় চাকুরী করে পুনরায় মুন্সীগঞ্জে বদলী হয়ে এসেছি। সর্বশেষ মাদারীপুরে বদলী প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে রীট করেছি। বর্তমানে রীট মামলা বিচারাধীন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. কামরুল জমাদ্দার বলেন, তিনি ভিডিও ফুটেজটি দেখেছেন এবং স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমানের ভাইরাল ভিডিও সংক্রান্ত বিষয়ে তাকে তিন দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দিতে বলা হয়েছিল এবং তিনি ইতোমধ্যে তা জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি, ঘুষ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে নতুন করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এফপি/এমআই