চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য খাল এক সময় ছিল এই অঞ্চলের জীবনধারা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব খালের জোয়ার-ভাটা, স্বচ্ছ পানি এবং স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর নির্ভর করেই চলত কৃষি সেচ, মাছ ধরা, এমনকি অনেক এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দখল, দূষণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে চট্টগ্রামের অধিকাংশ খাল আজ প্রায় অস্তিত্ব সংকটে। কোথাও খাল ভরাট হয়ে গেছে, কোথাও বর্জ্যে ভরে পানি কালো হয়ে গেছে, আবার কোথাও দখলদারদের কবলে পড়ে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
পটিয়া উপজেলার ভেল্লাপাড়া হয়ে শান্তিরহাট-মনসারটেক পর্যন্ত বিস্তৃত আলম খাল এই বাস্তবতার একটি প্রতীকী উদাহরণ। এক সময় এই খালের পানি দিয়ে আশপাশের বিস্তীর্ণ জমিতে সেচ দেওয়া হতো। শুষ্ক মৌসুমেও খালে পানি থাকত এবং জোয়ার-ভাটার প্রভাবে খালের পানি প্রবাহিত হতো স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু বর্তমানে সেই খালটি বিভিন্ন স্থানে ভরাট হয়ে গেছে, কোথাও দখল হয়ে গেছে, আবার কোথাও আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। ফলে খালের পানি এখন প্রায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শুধু আলম খাল নয়, চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার অধিকাংশ খালেরই একই অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব খালের অনেকগুলোই ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে। কোথাও অবৈধ স্থাপনা, কোথাও শিল্প বর্জ্য কিংবা গৃহস্থালি বর্জ্যের কারণে খালগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে শুধু পরিবেশ নয়, কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের খালগুলো পুনরুদ্ধারে বড় উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। খাল খনন, সংস্কার এবং উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করতে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার খালের সংখ্যা, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, দখলের পরিমাণ এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনায় দুটি সার্কেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে খালগুলোর অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরির জন্য। ইতোমধ্যে কয়েকটি উপজেলার খালের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি উপজেলার তথ্যও দ্রুত সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য হাতে পাওয়ার পর একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে খাল পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের তৃণমূল পর্যায়ের খালগুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সব তথ্য একত্রিত হওয়ার পর খালগুলো পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় পড়ে থাকা এসব খালে আবারও প্রাণ ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা খালগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনেক খাল রয়েছে যেগুলো স্থানীয় নদ-নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। যেমন হাটহাজারীতে বালুখালী খাল, চ্যাংখালী ও মিঠাছড়া খাল হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। মিরসরাইয়ে রয়েছে গোভনিয়া ও গৌরিনাথপুর খাল। সীতাকুণ্ডে রয়েছে মদন, বাঁশবাড়িয়া, কুমিরা, কুঁয়েশ, বাড়বকুণ্ড ও ছলিমপুর খাল। রাঙ্গুনিয়ায় রয়েছে শিলক, কাটাখালী, কুলকুরমাই ও চেঙখালী খাল। রাউজানে রয়েছে রাউজান, ডাবুয়া, সর্তা ও খাসখালী খাল। একইভাবে বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন উপজেলাতেও বহু গুরুত্বপূর্ণ খাল রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলো বর্তমানে দখল ও দূষণের কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খালগুলো শুধু পানি প্রবাহের মাধ্যম নয়; এগুলো একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাল থাকলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয়, জলাবদ্ধতা কমে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও স্বাভাবিক থাকে। একই সঙ্গে খালগুলো কৃষি সেচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যও ফিরে আসতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বহু বছর ধরে খালগুলো সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। আবার কোথাও খাল আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা বাড়ছে।
সরকারের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলের এসব খাল আবারও সচল হয়ে উঠতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে কৃষি, পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দখলের কবল থেকে মুক্ত হয়ে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জলপথগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পাবে—এমন প্রত্যাশাই এখন স্থানীয় মানুষের।
এফপি/অ