দীর্ঘ ২০ বছর পর চট্টগ্রামে জনসমাবেশে হাজির হয়ে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত এই সমাবেশে চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢল নামে। মাঠ ও আশপাশের এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, যা সাম্প্রতিক সময়ের চট্টগ্রামের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সমাবেশে পরিণত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, বিএনপিই দেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা ক্ষমতায় থাকাকালে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে বাস্তব ও দৃশ্যমান কাজ করেছে। তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হরণ করা হয়েছে, বাকস্বাধীনতা দমন করা হয়েছে এবং ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছিল এই দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের মানুষ আর অন্যায় ও অবিচারের রাজনীতি মেনে নেবে না। তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখন নিরাপদ রাষ্ট্রব্যবস্থা, নিরাপদ কর্মসংস্থান, স্বাধীন ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে।
তিনি জানান, বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে তরুণ প্রজন্মকে সামনে রেখে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ হলেও তারা কর্মসংস্থান ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। বিএনপি সরকারের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের ইপিজেডগুলো ছিল সেই সফল উদ্যোগের বাস্তব উদাহরণ। আগামীতে আরও নতুন ইপিজেড ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলে যুব সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, অতীতের বিএনপি সরকার প্রমাণ করেছে যে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অপরাধ ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভবিষ্যতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
জলাবদ্ধতা ও বন্যা সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি দেশের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে খাল খনন ও পানি ব্যবস্থাপনায় জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে, যা দেশের জীবনমান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সমাবেশে তারেক রহমান আসন্ন নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দেশের জন্য একটি নির্ধারণী মুহূর্ত। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটই ঠিক করবে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে ফিরবে, নাকি দমন-পীড়নের রাজনীতি অব্যাহত থাকবে। তিনি জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম সবসময় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল এবং এই জনসমাবেশ প্রমাণ করেছে যে দেশের মানুষ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন পর তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই সমাবেশ নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মানুষ সবসময় অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে এবং আগামীর রাজনৈতিক লড়াইয়েও চট্টগ্রাম অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।
সমাবেশে চট্টগ্রাম মহানগর ছাড়াও কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরসহ চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মিছিল নিয়ে অংশ নেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সমাবেশে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বেলা সোয়া ১২টার দিকে তারেক রহমান মঞ্চে ওঠেন। এ সময় করতালি ও স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি চট্টগ্রামের সব আসনের বিএনপি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন।
এফপি/এমআই