জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যেকোনও সময় প্রকাশ করতে পারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আরেক দফা বৈঠকের পর সেপ্টেম্বরে এর চূড়ান্ত রূপ দেখাতে চায় কমিশন। তবে সনদে সই করা নিয়ে এখনও দ্বিধায় রয়েছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা বামপন্থী দলগুলো।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাসদ ও বাসদ (মার্কসবাদী)—এই চার বাম দলের নেতারা জানিয়েছেন, অনেক বিষয়ে সমঝোতা হলেও বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতির প্রশ্নে তারা আপস করবেন না। তাদের দাবি, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হলে সনদে স্বাক্ষরের প্রশ্নই ওঠে না।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের খসড়ায় বিদ্যমান চার মূলনীতির পরিবর্তে প্রস্তাব করা হয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতির মতো নতুন উপাদান। শুরু থেকেই এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে বাম দলগুলো। তাদের বক্তব্য, বাহাত্তরের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিকৃত করে কোনও সমঝোতা সম্ভব নয়।
এছাড়া তারা অভিযোগ করছে, সনদের প্রস্তাবিত প্রস্তাবনায় পাকিস্তানের জন্ম, ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক উল্লেখ নেই। মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত সংবিধানের চার মূলনীতিও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
বাম দলগুলো বলছে, সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার শুধু নির্বাচিত সংসদের হাতে থাকতে হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে তা করা যাবে না। কমিশনের খসড়ায় সনদকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়ার যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তাকে অগ্রহণযোগ্য বলছে তারা।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, প্রথম খসড়ায় সংসদের মাধ্যমে সংশোধনের প্রস্তাব থাকায় আমাদের আপত্তি ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় খসড়ায় দেখা যাচ্ছে, কাজটি বর্তমান সরকার করতে চাচ্ছে। এটি সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, সনদের বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না—এমন প্রস্তাব একেবারেই বাদ দিতে হবে। এটি ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরিপন্থি।
গত ৩১ জুলাই কমিশনের বৈঠকে চার মূলনীতি পরিবর্তনের প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা জানিয়ে বৈঠক বর্জন করেন বাম নেতারা। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে কমিশনের কোনও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি। বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, আমরা বৈঠক বর্জন করার পর কমিশন আর যোগাযোগ করেনি। খসড়ায় মতামত দিয়েছি, এখন বল সরকারের কোর্টে।
বাম নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার মূল প্রশ্নে আপস হবে না।
সিপিবির রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সংবিধানের চার মূলনীতি বাদ দিলে সনদে সই করা সম্ভব নয়।
বাসদের বজলুর রশিদ ফিরোজ মনে করেন, জুলাই সনদ হওয়া দরকার, কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে ছাড় নেই।
জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, নোট অব ডিসেন্ট রাখারও সুযোগ নেই। মূলনীতি প্রশ্নে কোনও রকম বাতিলের চেষ্টা হলে আমরা স্বাক্ষর করবো না।
বাসদ (মার্কসবাদী)-এর মাসুদ রানা বলেন, সনদে ধর্মনিরপেক্ষ, শোষণমুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রতিফলন থাকতে হবে। আপত্তির জায়গাগুলো সংশোধন না হলে আমরা সই করবো না।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ করা হবে। এখন পর্যন্ত ২৬টি দল লিখিত মতামত দিয়েছে। বাম দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট: কেবল যে বিষয়গুলোতে সর্বসম্মত মত হয়েছে, সেগুলোই চূড়ান্ত সনদে রাখা উচিত।
এফপি/রাজ