কারাম ডালকে ঘিরে পূজা, উপবাস, কিচ্ছা, নাচ-গান আর লোকজ ঐতিহ্যের নানা আয়োজনে নওগাঁর পত্নীতলায় উদযাপিত হয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার নজিপুর হাইস্কুল মাঠে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, পত্নীতলা উপজেলা শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। এতে পত্নীতলা ছাড়াও মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা ও ধামইরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়।
এর আগে মঙ্গলবার বুজরুক মামুদপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় কারাম পূজার মূল আয়োজন। দিনভর উপবাসের পর সন্ধ্যায় একদল কিশোরী কারামগাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করেন। পরে দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও ফলমূল উৎসর্গের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজাস্থলে জড়ো হন শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। পুরোহিতের কিচ্ছায় উঠে আসে কার্মা ও ধার্মা দুই ভাইয়ের কাহিনি। কিচ্ছা শেষে নারীরা পরস্পরকে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপবাস ভাঙেন। এরপর কারাম ডাল ঘিরে ঢাক, মাদল ও করতালের তালে শুরু হয় নাচ-গান।
বুধবার বিকেলে ধর্মীয় আচার শেষে গীত গাইতে গাইতে কারাম ডাল নিয়ে যাওয়া হয় নজিপুর হাইস্কুল মাঠে। সেখানে ডালটি স্থাপন করে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নৃত্যদলগুলো ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করে। নাচ-গান ও উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। পরে কারাম ডাল আত্রাই নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম মূলত ফসলকেন্দ্রিক উৎসব। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে অনুষ্ঠিত এ উৎসবকে অনেকে ‘ডালপূজা’ও বলেন। কারাম বৃক্ষের সঙ্গে কৃষি ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন তারা। উৎসবের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জমির উর্বরতা, ভালো ফসল ও পরিবারের মঙ্গল কামনা করা হয়।
উৎসবে অংশ নেওয়া বুজরুক গ্রামের বিসরি এক্কা, সোহাগী টপ্প্যা ও ধরনাই বিজিপাড়ার সবিতা কুজুরসহ কয়েকজন নারী বলেন, আগে প্রতিবছর গ্রামে কারাম উৎসব হতো। তবে খরচের কারণে এখন প্রতিবছর আয়োজন করা সম্ভব হয় না। সহযোগিতা পেলে আবারও উৎসবের আয়োজন করা হয়। উৎসবকে ঘিরে গ্রামে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয় এবং আত্মীয়-স্বজনেরাও আসেন।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি সুবোধ ওঁরাও বলেন, ‘কারাম ডাল ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের কথাও এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়। আধুনিকতার প্রভাবের মধ্যেও এই ঐতিহ্য ধরে রাখা জরুরি।’
পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক যোগেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, নওগাঁর প্রায় সব উপজেলাতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। কারাম পূজা সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী আয়োজনগুলোর একটি।
উৎসবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি সামসুজ্জোহা খান জোহা, পত্নীতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা, চলচ্চিত্র শিল্পী ড্যানি সিডাক, ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গণি শোভন, অ্যাসেড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুরাদ, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ফারুকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকদের মতে, কারাম উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার বা বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নাচ, গান ও লোকজ আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকছে এই ঐতিহ্য।
এফপি/র