বাহিনীর ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর আনসারের (ডিএমএ) ৩০০ জন শহর প্রতিরক্ষা দল (টিডিপি) নারী সদস্যার ভাগ্য বদলের লক্ষ্যে শুরু হয়েছে বাছাই কার্যক্রম।
ইউরোপে একটি সুন্দর কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশের কোটি তরুণ-তরুণী। তবে এই স্বপ্নের আড়ালে রয়েছে কিছু অন্ধকার বাস্তবতা। প্রতিনিয়ত শত শত যুবক জমি-জমা বিক্রি করে দালালের খপ্পরে পড়ছেন। আবার অনেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। চিরচেনা এই প্রতারণার বৃত্ত ভেঙে এবার সম্পূর্ণ নিরাপদ, বৈধ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইউরোপের দেশ মলদোভায় দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা। দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং শতভাগ মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে পাঁচটি শক্তিশালী বাছাই কমিটি। অনিয়মের কোনো সুযোগ বন্ধ রাখতে কমিটিগুলো সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিটি ধাপ তদারকি করছে। বাহিনীর সদর দপ্তরে কঠোর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এই দক্ষ মানবসম্পদ নির্বাচন প্রক্রিয়া, যা দেশের অভিবাসন খাতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
বুধবার (০৮ জুলাই) ২০২৬ বাছাই কার্যক্রমের প্রথম ধাপে ঢাকা মহানগর আনসার উত্তর ও পূর্ব জোনের প্রাথমিক বাছাইয়ে উত্তীর্ণ ১৩৯ জন টিডিপি নারী সদস্য অংশ নেন। বিদেশ গমনেচ্ছু এসব প্রার্থী বাহিনীর সদর দপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত ‘স্বঘোষণা’ (স্ব-ঘোষণা) ফর্মে স্বাক্ষর করেন। এরপর শুরু হয় মূল পরীক্ষা।
প্রথাগত কাগজ-কলমের পরীক্ষার পরিবর্তে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিকে। পরীক্ষা কক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের কঠোর নজরদারিতে প্রার্থীরা নিজ নিজ স্মার্টফোনের জিমেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সরাসরি ‘গুগল ফর্ম’-এর মাধ্যমে লাইভ লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন।
এ ছাড়া প্রার্থীদের ওজন ও উচ্চতা পরিমাপসহ প্রয়োজনীয় শারীরিক যোগ্যতা যাচাই করা হয়। এরপর পাঁচটি বাছাই কমিটির সমন্বয়ে গঠিত জুরি বোর্ডের সামনে সরাসরি সাক্ষাৎকারে অংশ নেন প্রার্থীরা।
আধুনিক এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি ধাপের পরীক্ষার মূল্যায়ন একটি বিশেষায়িত সফটওয়্যারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে কোনো ধরনের মানবিক হস্তক্ষেপ বা কারচুপির সুযোগ ছাড়াই সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেধাতালিকা ও মূল্যায়ন মান প্রস্তুত করছে।
ঢাকা মহানগর আনসার উত্তর ও পূর্ব জোনের সফল বাছাই পর্ব শেষে ধারাবাহিকতায় ০৯ জুলাই ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) দ্বিতীয় ধাপে অংশ নিচ্ছেন ঢাকা মহানগর আনসার দক্ষিণ ও পশ্চিম জোনের আরও ১৬১ জন টিডিপি নারী সদস্য। একই পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ কঠোর নজরদারির মাধ্যমে গুগল ফর্মে লাইভ পরীক্ষা এবং জুরি বোর্ডের সাক্ষাৎকারে অংশ নিচ্ছেন প্রার্থীরা।
পুরো আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো ‘বাছাইয়ে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা’। কোনো ধরনের তদবির, আর্থিক লেনদেন বা স্বজনপ্রীতির সুযোগ না রেখে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন পদ্ধতি দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন আগত তরুণীরা। এই প্রক্রিয়া যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে ফিরিয়ে এনেছে আত্মবিশ্বাস।
কেবল যোগ্য কর্মী নির্বাচন করাই এই উদ্যোগের শেষ লক্ষ্য নয়। মান নিয়ন্ত্রণেও আপসহীন অবস্থান নিয়েছে বাহিনী। মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। নির্বাচিত প্রার্থীদের ইউরোপের সমাজ, সংস্কৃতি ও কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ মডিউল।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রার্থীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গড়ে তোলা হবে দৃঢ় মানসিকতা। এই আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি তাদের বিদেশে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সফল হতে সহায়তা করবে।
ইউরোপে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখা দেশের লাখো তরুণীর জন্য এই উদ্যোগ এখন এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ অভিবাসনের পথ বাদ দিয়ে বৈধ উপায়ে ইউরোপের মাটিতে পা রাখার সুযোগ তৈরি হলে তা অন্য নারীদের মাঝেও আত্মবিশ্বাস ও সাহস জোগাবে।
দালালমুক্ত এবং সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক ইউরোপ যাত্রার এই মডেল সফল হলে তা দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
প্রশিক্ষণ শেষে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন শুধু নারীদের কর্মসংস্থান ও পারিবারিক সচ্ছলতা আনবে না, বরং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি যোগ করবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে উজ্জ্বল হবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও সুনাম।
ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে এই উদ্যোগের সুফল ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বমঞ্চে। এটি একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নারী জাগরণ ও ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এফপি/র