রেফারি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজাতেই মুখ ঢেকে ফেলেন লিওনেল মেসি। লাওতারো মার্টিনেজ, রোমারোরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেন দলের কাপ্তান বিশ্বসেরা ফুটবলারকে। মেসি কাঁদছেন জয়ের আনন্দে।
সতীর্থরা উচ্ছ্বাস করছেন অধিনায়কের সঙ্গী হয়ে। ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২ গোলে পিছিয়ে থেকে যখন ছিটকে পড়ার আশঙ্কায়, তখনই ১৩ মিনিটের ম্যাজিকে আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ফেলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরো, মেসি ও এঞ্জো ফার্নান্দেজের জাদুতে পিরামিডের দেশ মিসরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের রুদ্ধশ্বাস জয় তুলে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ১১ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা মুখোমুখি হবে সুইজারল্যান্ড-কলম্বিয়া ম্যাচের জয়ী দলের বিপক্ষে। রাউন্ড অব থার্টি টুতে নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা জিতেছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৩-২ গোলে। প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালেও জিতেছে একই ব্যবধানে। কিন্তু এবারের গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। মিসরের বিপক্ষের গল্পটা ব্রাজিলের পর আর্জেন্টিনাকে টানা বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আরলিং হলান্ড, কিংবা হ্যারি কেইন চলতি বিশ্বকাপে পাল্লা দিয়ে গোল করছেন। এসব তারকার ভিড়ে আলো কেড়ে নেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ো। স্পেনের বিপক্ষে ভোজিনিয়ো যে জাদুকরী খেলা উপহার দিয়েছিলেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গতকাল পিরামিডের দেশের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের একইভাবে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রথমার্ধে ৩টি নিশ্চিত গোল রক্ষা করেন তিনি। ১৯ মিনিটে মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন। হাইসেম হাসান বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে বক্সে ফাউল করেন আর্জেন্টিনার একজন ফুটবলারকে। রেফারি পেনাল্টি দেন। চলতি বিশ্বকাপে ৮ গোলের টার্গেটে পেনাল্টি শট নেন মেসি। কিন্তু শোবের ডান দিকে ঝাঁপিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে বাঁচিয়ে দেন পেনাল্টি। চলতি আসরে এটা মেসির দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। এর আগে গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মিস করেছিলেন। নিজের ছয়টি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৮টি পেনাল্টি শট নিয়ে ৪টি মিস করেন মেসি। দুটিই এবারের আসরে। প্রথমার্ধে আরও দুটি শট নিশ্চিতভাবে রক্ষা করেন মিসরের গোলরক্ষক। ২৮ মিনিটে ম্যাক অ্যালিয়েস্টারের হেড দারুণভাবে রক্ষা করেন। ৩১ মিনিটে মেসির ফ্রি কিক মিসরের গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেও সাইডপোস্টে লেগে বাইরে চলে যায়। প্রথমার্ধের পুরোটা সময় ছিল আর্জেন্টিনার দখলে। অথচ প্রথমার্ধ শুরু হয় মিসরের গোলে। ম্যাচের ১৫ মিনিটে এগিয়ে যায় সালাহর দল। মারওয়ান আত্তিয়া চমৎকার ক্রসে লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাঁকি দিয়ে নিখুঁত হেডে ব্যবধান ১-০ করেন ইয়াসের ইব্রাহিম। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ চেয়ে চেয়ে শুধু দেখেন। প্রথমার্ধ শেষ হয় মিসরের এগিয়ে যাওয়ায়।
দ্বিতীয়ার্ধে গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠেন মেসিরা। একের পর এক আক্রমণে বেসামাল করেন মিসরের রক্ষণভাগ। এর মধ্যে মিসরের দ্বিতীয় গোল বাতিল হয় ভিআরে। নিজ বক্স থেকে হাসান একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে পাস করেন আগুয়ান মোস্তফা জিকোকে। জিকো ভুল করেননি। চলতি বলে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক মার্তিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান। কিন্তু রেফারি ভিআরে সেটা বাতিল করেন। ৬৭ মিনিটে ২-০ গোলে লিড নিয়ে প্রথমবার প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে মিসর। নিজেদের বক্স থেকে বাড়ানো বল ধরে মোহাম্মদ সালাহ ডান দিকে আগুয়ান হাইসেম হাসানকে দেন। হাসান ফাঁকায় বল ঠেলে দেন। এবারও ভুল করেননি মোস্তফা জিকো। ডান পায়ের শটে বল জালে পাঠিয়ে চমকে দেন মেসিসহ আর্জেন্টিনাকে। এর পরই আর্জেন্টিনার ম্যাজিক দেখে মিসরসহ গোটা বিশ্ব। ৭৯ থেকে ৯২-মাত্র ১৩ মিনিটের ম্যাজিকে মেসিবাহিনী লন্ডভন্ড করে দেয় সালাহদের ইতিহাস লেখার স্বপ্ন। ৭৯ মিনিটে রোমেরো দুর্দান্ত এক হেডে ব্যবধান ১-২ করেন। ওই গোলেই ম্যাচে ফেরে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ৮৩ মিনিটে ম্যাচের গল্পটা অন্যভাবে লেখেন লিওনেল মেসি। পেনাল্টি মিস করে চাপে থাকা সাতবারের বিশ্বসেরা ফুটবলার মেসি ডি-বক্সের ভিতর থেকে বাঁ পায়ের বুলেটগতির শটে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান ২-২ গোলে। চলতি বিশ্বকাপে মেসির এটা ৮ নম্বর গোল। বিশ্বকাপে এটা তাঁর ২১তম গোল। এরপর ম্যাচ গড়ায় নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে যোগ করা সময়ে। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় বা ম্যাচের ৯২ মিনিটে এঞ্জো ফার্নান্দেজ চোখধাঁধানো হেডে ব্যবধান ৩-২ করেন।
৫ গোলের ম্যাচের শেষ দিকে কিছুটা উত্তেজনা ছড়ায়। কিন্তুফলাফলে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। সারা বিশ্বের কোটি কোটি আকাশি-নীল-সাদা জার্সিধারীদের উৎসবে মাতিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ে পাইপলাইনে উঠে যায় আলবিসেলেস্তারা।
এফপি/অ