গত কয়েক দিনের অব্যহত ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল ও জলাজটে জেলার ৯টি উপজেলার প্রায় অর্ধশত ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ঈদগাঁও, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও টেকনাফের লাখো মানুষ জলদূর্ভোগে পড়েছেন। অপরদিকে, পাহাড়ধসের ঘটনায় দুইদিনে জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের বড়ছড়া এলাকায় পাহাড়ধসে মারাগেছেন গৃহবধূ নাছিমা আক্তার লিমা (২৭)। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার স্বামী জসিম উদ্দিন।ভূমিধসে গত ৪ জুলাই থেকে ৭ জুলাই সকাল পর্যন্ত অন্তত ১০জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। আগামী দুই-তিন দিনও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ায় টানা পাঁচ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌযোগাযোগ। সাগরে পানির উচ্চতা বেড়ে দ্বীপের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তাল সাগরের উপচে পড়া ঢেউ দ্বীপের চারপাশে আছড়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে আছেন স্থানীয়রা। একইভাবে মহেশখালী- কক্সবাজার নৌরুটেও যাতায়ত দূর্ভোগে পড়েছেন দ্বীপবাসী।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারি আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ছয়টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সকাল ৬টা হতে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৪৭ মিলিমিটার। ৩৩ ঘন্টার মোট বৃষ্টিপাত ১৭৬ মিলিমিটার। এতে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
একইদিন বিকেলে অতিবৃষ্টির কারণে উখিয়ায় মাটির তৈরি ঘরের দেয়াল ধসে পড়ে মো. মানিক (৪০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওর্য়াডের জামবাগান নামক এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। হলদিয়াপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরী তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন।
এর আগে সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাতে টানা বৃষ্টিতে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসে আট রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। একই সময় কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান আরও একজন। পেকুয়ায় মাটির ঘর ধসে মারা যায় এক শিশু। সব মিলিয়ে গত দুদিনে জেলায় পাহাড়ধস ও ঘরধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম (আরসিপি) সূত্র মতে, টানা ভারী বর্ষণে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও । এ সময় আহত হয়েছেন আরও ১০জন। দুর্যোগে প্রায় ১৫ হাজার ৮১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩ হাজার ১৮২ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
আরসিপির তথ্যমতে, এ সময়ে ক্যাম্পগুলোতে মোট ১৬০টি দুর্যোগজনিত ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫২টি ভূমিধস, ১৪টি আকস্মিক বন্যা এবং ৮৩টি ঝড়ের ঘটনা রয়েছে। এছাড়া এক হাজার ৬১৪টি আশ্রয় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১০টি আশ্রয় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্প-৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫-এ ভূমিধস ও দুর্যোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব ক্যাম্পে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের মধ্যে অন্তত ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
সাধারণত জরুরি পরিস্থিতিতে লার্নিং সেন্টার, বিভিন্ন বিতরণ কেন্দ্র, নারী ও শিশুদের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ স্থান ব্যবহার করে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। তবে অর্থসংকটের কারণে অনেক লার্নিং সেন্টারের অবস্থা এখন আর আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী নেই।
ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আত্মীয়-স্বজনের ঘরবাড়ি এবং বিভিন্ন কমিউনিটি স্পেসে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে পাহাড় ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৪৮৯টি রোহিঙ্গা পরিবারকে অন্যত্রে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেও সেই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ইউনিয়নের অন্তত ৪০০টি ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন সড়ক।
শতাধিক কাঁচা ঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে হোয়াইক্যং, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে।
টেকনাফের ইউএনও এস এম মো. অনীক চৌধুরী বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হচ্ছে এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে, উত্তাল সাগর ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে টানা পাঁচ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথ। এতে দ্বীপটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় সেন্ট মার্টিনের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী টেকনাফে এসে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। জেলা প্রশাসন তাদের পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ফয়েজুল ইসলাম বলেন, নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বীপে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার লেমশীখালী-কৈয়ারবিল সড়কের একটি জরাজীর্ণ সেতু ভেঙে পড়ায় দুই এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ঈদগাঁও উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা মংচিংনু মারমা জানান, উপজেলার ঈদগাঁও বাজার এলাকা, ইসলামপুর ও পোকখালী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। জলাবদ্ধতা ও প্লাবিত এলাকার পানি নিষ্কাশনে উপজেলা প্রশাসন স্লুইসগেট খোলা, ড্রেনেজ পরিস্কারের কাজ করেছে।
থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হওয়ায অনেক স্থানের পানি নেমে যাচ্ছে। পাহাড়ি ঢালু বা পাদদেশে থাকা এবং জলমগ্ন দূর্গত পরিবারগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। প্রস্তুত রয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।
সার্বক্ষণিক খোলা কন্ট্রোল রুমে ০১৭২১৫৮৮৭৫৬ নাম্বারে যোগাযোগ করে সেবা নিতে দুর্গতদের প্রতি অনুরোধ জানান ইউএনও।
অপরদিকে, কক্সবাজার পৌরসভার হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা, টেকপাড়া, পেশকারপাড়া, বাজারঘাটা, কালুর দোকান, তারাবনিয়াছড়া, দক্ষিণ রুমালিয়ারছরা, আলীরজাহাল, বাস টার্মিনাল ও বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পর্যটকেরাও।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আরো কয়েকদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নতুন করে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে কক্সবাজারে একই ধরনের দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, দুর্বল অবকাঠামো এবং সীমিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কারণে জেলার মানুষকে বারবার একই সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সাময়িক উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, মুষলধারে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে থেমে থেমে দিচ্ছে। এতেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় কক্সবাজার শহর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে অন্তত এক হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। দুর্গতদের জন্য মজুদ রয়েছে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার।
এফপি/সা