বিশ্বকাপে আরেকটি ম্যাচ, আরেক দফা রেকর্ডের বন্যা। লিওনেল মেসি মাঠে নামলেই নতুন কোনো না কোনো ইতিহাস লেখা হয়- ফুটবল ধারাভাষ্যকারদের বহুল ব্যবহৃত এই কথাটি যেন আবারও সত্যি প্রমাণ করলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের জয়ে দলের প্রথম গোলটি করেন মেসি। আর সেই এক গোলেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন একের পর এক নতুন কীর্তি।
মায়ামি স্টেডিয়ামের এই ম্যাচে গোল করে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মেসির মোট গোলে অবদান দাঁড়িয়েছে ১২টি। এর মধ্যে ৬টি গোল, ৬টি অ্যাসিস্ট। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান সংরক্ষণের ইতিহাসে নকআউট পর্বে কোনো ফুটবলারের এত বেশি গোলে অবদান নেই। এতদিন ১১টি করে গোলে অবদান রেখে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করে সেই রেকর্ড একাই নিজের করে নিয়েছেন মেসি।
এই গোলের মাধ্যমে আরেকটি অনন্য মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বিশ্বকাপে মোট গোলসংখ্যা ২০-এ পৌঁছে ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে এই অর্জনের মালিক হয়েছেন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এমবাপ্পের গোলসংখ্যা এখন ১৮।
শুধু মোট গোল নয়, ধারাবাহিক গোল করার ক্ষেত্রেও নতুন মানদণ্ড গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপে টানা আট ম্যাচে গোল করে ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হয়েছেন তিনি। এর আগে কোনো খেলোয়াড়ই টানা ছয় ম্যাচের বেশি গোল করতে পারেননি।
মেসির ধারাবাহিকতার আরেকটি বড় উদাহরণ পাওয়া যায় সাম্প্রতিক দুই বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তিনি করেছিলেন ৭ গোল। এবার মাত্র চার ম্যাচ খেলেই সেই সংখ্যায় পৌঁছে গেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একাধিক আসরে অন্তত ৭ গোল করার কীর্তিও এর আগে কারও ছিল না।
এখন মেসির সামনে আরও দুটি ঐতিহাসিক রেকর্ড ভাঙার সুযোগ। আর্জেন্টিনার হয়ে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৮ গোলের রেকর্ডটি ১৯৩০ আসরে গড়া গুইলার্মো স্তাবিলের। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার কোনো ফুটবলারের এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৯ গোলের রেকর্ডটি ১৯৫০ সালে গড়েছিলেন আদেমিরে ডি মেনেজেস। বর্তমানে ৭ গোল নিয়ে এই দুই রেকর্ডের খুব কাছেই অবস্থান করছেন মেসি।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা পাঁচ ম্যাচে গোল করেও বিরল এক কীর্তির অংশ হয়েছেন আর্জেন্টাইন তারকা। এর আগে শুধু হাঙ্গেরির গিয়র্গি সারোসি (১৯৩৪-১৯৩৮) এবং ব্রাজিলের ভাভারই (১৯৫৮-১৯৬২) এমন ধারাবাহিকতা দেখাতে পেরেছিলেন। এই পাঁচ ম্যাচে মেসির অবদানও চোখে পড়ার মতো ৬ গোলের পাশাপাশি করেছেন ৪টি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ নকআউট পর্বের এই সময়টাতে তিনি সরাসরি অবদান রেখেছেন ১০টি গোলে।
বয়সও যেন মেসির জন্য কেবল একটি সংখ্যা। ৩৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর বিশ্বকাপে তিনি ইতোমধ্যে করেছেন ১৪ গোল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ৩৫ বছর বয়সের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল মাত্র ৫টি, যা ক্যামেরুনের কিংবদন্তি রজার মিলারের দখলে। এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে মেসির আধিপত্য কতটা একচ্ছত্র।
বৈচিত্র্যময় প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও সমান সফল তিনি। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ২২টি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে খেলেছেন মেসি, যার মধ্যে ১৪টি দলের বিপক্ষেই গোল করার কৃতিত্ব রয়েছে তার।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ৩০তম উপস্থিতি। এই সংখ্যায় পৌঁছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হয়েছেন তিনি। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, যার ম্যাচসংখ্যা ২৬। একই সঙ্গে এটি ছিল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মেসির ১৩তম ম্যাচ। এই তালিকায় তার সামনে আছেন শুধু জার্মানির মিরোস্লেভ ক্লোসা, যার নকআউট ম্যাচসংখ্যা ১৪।
একটি ম্যাচ, একটি গোল, আর তার সঙ্গে ইতিহাসের পাতায় যোগ হলো আরও অসংখ্য নতুন অধ্যায়। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে যেন নিজের কিংবদন্তিকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। সামনে যত ম্যাচ, ততই বাড়তে পারে তার রেকর্ডের তালিকা।
এফপি/অ