চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্প নতুন গতি পেয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এই প্রকল্পে প্রায় ১০০ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে।
সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, চলতি মাসের মধ্যেই ঋণচুক্তির সব শর্ত চূড়ান্ত হতে পারে। এই অর্থায়ন বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতে এটি একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
বর্তমানে ১৯৬৮ সালে নির্মিত ইস্টার্ন রিফাইনারির পুরোনো ইউনিট বছরে প্রায় পনেরো লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে, যা দেশের মোট চাহিদার একটি সীমিত অংশ পূরণ করে। ফলে বড় একটি অংশের জ্বালানি এখনো আমদানিনির্ভর। নতুন দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে শোধন ক্ষমতা আরও ত্রিশ লাখ টন বৃদ্ধি পেয়ে মোট পঁয়তাল্লিশ লাখ টনে পৌঁছাবে। এতে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় অর্ধেক দেশেই পরিশোধন করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি তেলের আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি প্রতি লিটার ডিজেলে কয়েক টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন ইউনিটে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ইউরো ফাইভ মানের জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সালফারের পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকবে, যা পরিবেশ দূষণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পেট্রোল, ডিজেল, জেট ফুয়েল, এলপিজি এবং অন্যান্য জ্বালানি উৎপাদনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এই ঋণ ব্যবস্থাটি শরিয়াহভিত্তিক ফরওয়ার্ড লিজ পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। অর্থাৎ ব্যাংক সরাসরি যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো কিনে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইজারা দেবে। নির্ধারিত সময় ধরে কিস্তি পরিশোধ শেষে পুরো মালিকানা বাংলাদেশের পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তবে এই অর্থায়নের সঙ্গে কিছু কঠোর শর্তও যুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সুদের মানদণ্ডের ভিত্তিতে ঋণের খরচ নির্ধারিত হবে এবং নির্দিষ্ট একটি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে তা পরিবর্তিত হবে। নির্মাণকালীন সময়েও নির্দিষ্ট সময় পর পর কিস্তি বা সুদ পরিশোধ করতে হবে। প্রতিটি ধাপে প্রশাসনিক অগ্রগতি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে, অন্যথায় ঋণ বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। অর্থ ছাড়ের আগে পরিবেশগত অনুমোদন, আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং বিভিন্ন আইনি শর্ত পূরণ করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই প্রকল্পটি প্রথমে দুই হাজার আট সালে প্রস্তাবিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যয় একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতায় এটি বিলম্বিত হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পটি পুনর্গঠন করে প্রায় একত্রিশ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই হাজার ত্রিশ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। আমদানি নির্ভরতা কমে যাবে, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় বাড়বে এবং শিল্প ও পরিবহন খাতে স্থিতিশীলতা তৈরি হবে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত তেল খালাসের আধুনিক অবকাঠামো ইতিমধ্যেই চালু থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পকে দেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি ও শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এফপি/এমআই