যশোরের কেশবপুর উপজেলায় মাছের ঘেরে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং ফসলি জমির মাটি কেটে উঁচু পাড় নির্মাণের কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন কৃষক, পরিবেশ সচেতন নাগরিক ও সাধারণ মানুষ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানা কার্যক্রম চললেও অবৈধ পানি উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
কৃষিপ্রধান কেশবপুরে একসময় বর্ষার অতিরিক্ত পানি মাঠ-ঘাট পেরিয়ে খাল-বিল ও নদ-নদীতে স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে ব্যাপক হারে মাছের ঘের সম্প্রসারণ, ফসলি জমির মাটি কেটে উঁচু পাড় নির্মাণ এবং অপরিকল্পিতভাবে ঘের গড়ে ওঠার ফলে সেই প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, কেশবপুরে বর্তমানে ৪ হাজার ৬৫৮টি ছোট-বড় মৎস্য ঘের রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুমের আগেই অনেক ঘের মালিক ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে তাদের ঘের পানিতে পূর্ণ করে নিচ্ছেন। এতে একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
সরেজমিনে পৌরসভাসহ উপজেলার পাঁজিয়া, সুফলাকাটি, গৌরীঘোনা, আলতাপোল, মঙ্গলকোট, বিদ্যানন্দকাটি ও সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ঘেরে পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ঘের মালিক রাতের আঁধারে গভীর নলকূপ ব্যবহার করে পানি তুলছেন, যা প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, গত বছরের মতো এবারও অতিবৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তারা জানান, গত বছর অতিরিক্ত বৃষ্টি ও নদ-নদীর উপচে পড়া পানিতে কেশবপুরে ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়। ঘেরের উপচে পড়া পানি মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে এবং উপজেলার অন্তত ১০৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে মাছের ঘের, কৃষিজমি, রাস্তা-ঘাট ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্ষতির পরিমাণ ছিল শত শত কোটি টাকা।
কৃষকদের দাবি, ঘেরের উঁচু পাড় ও পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং ফসল নষ্ট হয়। বিশেষ করে ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিবেশবিদদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘অবৈধভাবে পানি উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। তবে কিছু ক্ষেত্রে রাতের বেলায় গোপনে পানি উত্তোলন করা হয়, ফলে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনায় কিছুটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। তারপরও নিয়মিত নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে’।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, শুধু জরিমানা নয়, অবৈধ পানি উত্তোলন ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্তকারী ঘেরগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ পুনরুদ্ধার, পরিবেশসম্মত মৎস্য চাষ নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিজমি রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
বর্ষা মৌসুমের আগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কেশবপুরে আবারও জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় অবৈধ পানি উত্তোলন বন্ধের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এফপি/অ