চট্টগ্রামে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও দ্রুত পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংকট। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কয়েকদিন পর পরীক্ষার রিপোর্টে শিশুদের হাম শনাক্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এতে পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, পাশাপাশি কমিউনিটিতে সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল চার বছর বয়সী শিশু আমিন। আটদিন চিকিৎসার পর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় তাকে বাড়ি পাঠানো হয়। কিন্তু বাড়ি ফেরার দুইদিন পর পরীক্ষার রিপোর্টে জানা যায়, সে হাম আক্রান্ত ছিল। একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে ২২ মাস বয়সী আসমা, পাঁচ বছরের সায়মা ও দেড় বছরের আয়েশার পরিবারও। তারা সবাই চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পর জানতে পারেন, তাদের সন্তানদের শরীরে হাম সংক্রমণ ছিল।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে এখন প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। উপসর্গ দেখে চিকিৎসা শুরু হলেও নিশ্চিত পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে সময় লাগছে ৭ থেকে ১০ দিন। এর মধ্যে অনেক রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাচ্ছেন, কেউ কেউ আবার গুরুতর অবস্থায় মৃত্যুবরণও করছে।
চিকিৎসকদের মতে, রিপোর্ট পেতে দীর্ঘসূত্রতা শুধু রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব ঘটাচ্ছে না, একই সঙ্গে হাসপাতাল ও সমাজে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, দ্রুত পরীক্ষা ও রিপোর্ট পাওয়া গেলে সামাজিক সংক্রমণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। বর্তমানে শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও হামের সংক্রমণ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেসের ক্লিনিক্যাল ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ জানান, অনেক অভিভাবক শিশুদের অবস্থা জটিল হওয়ার পর হাসপাতালে আনছেন। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় দ্রুত শনাক্ত করা গেলে একই ওয়ার্ডে থাকা অন্য শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমানো যেত। কিন্তু ল্যাব কনফার্মেশন পেতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে হাম শনাক্তের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হলেও আরটি-পিসিআর বা কনফার্মেটরি পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সব নমুনা ঢাকার জাতীয় ল্যাবে পাঠাতে হচ্ছে। পরিবহন, পরীক্ষার চাপ ও রিপোর্ট পাঠানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময় বেড়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, হামের পরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত ল্যাব ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে রোগীর চাপ বাড়ায় পরীক্ষার কার্যক্রম কিছুটা ধীরগতির হয়েছে। তবে টিকাদান কার্যক্রম চলমান থাকায় আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে হামের বাড়তি সংক্রমণে চমেক হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। হাসপাতালের ২০টি পিআইসিইউ শয্যার মধ্যে ১৫টি হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বরাদ্দ রাখা হলেও প্রতিদিনই শয্যার চেয়ে বেশি সংকটাপন্ন রোগী ভর্তি হচ্ছে। পৃথক ৫০ শয্যার হাম ওয়ার্ডেও প্রতিনিয়ত ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি থাকছে। অনেক ক্ষেত্রে এক শয্যায় দুই থেকে তিনজন শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানান, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। অনেকের ক্ষেত্রে ৬০ লিটার পর্যন্ত হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও শয্যা সংকটে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, সীমিত সম্পদ নিয়েই সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হাসপাতাল। সরকারি শয্যার পাশাপাশি অনুদানে পাওয়া কিছু যন্ত্রপাতি দিয়েও সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এফপি/অ