বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা ‘ফ্যাটি লিভার’। কোনো স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াই এটি শরীরে বাসা বাঁধে বলে একে ‘নীরব ঘাতক’ বা নীরব রোগ বলা হয়।
অনেকেরই ধারণা নেই যে তাদের লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমছে। সময়মতো এর যত্ন না নিলে লিভারে মারাত্মক প্রদাহ বা সিরোসিসের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রাথমিক অবস্থায় জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনলেই এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ফ্যাটি লিভার রোগ কী?
লিভারের কোষে যখন প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত চর্বি বা ফ্যাট জমা হয়, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলে।
এটি মূলত দুই প্রকার:
১. নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার: যারা মদ্যপান করেন না, মূলত স্থূলতা, ডায়াবেটিস বা অলস জীবনযাপনের কারণে তাদের এই রোগ হয়। এর একটি গুরুতর রূপ হলো ‘ন্যাশ’, যা লিভারের কোষ নষ্ট করে দেয়।
২. অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার: অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে লিভারে চর্বি জমলে তাকে এই নামে ডাকা হয়।
রোগটির কিছু সাধারণ কিন্তু উপেক্ষিত লক্ষণ
লিভারের সহ্যক্ষমতা অনেক বেশি হওয়ায় প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুবই মৃদু হয়, যা মানুষ সাধারণ ক্লান্তি বা গ্যাসের সমস্যা ভেবে ভুল করে।
নিচে এমন কিছু সূক্ষ্ম লক্ষণ দেওয়া হলো যা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়:
ক্রমাগত ক্লান্তি: পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও সারাক্ষণ শরীরে শক্তির অভাব বা অবসাদ বোধ হওয়া।
পেটের ডান পাশে ভারিভাব: ডান পাঁজরের ঠিক নিচে হালকা ব্যথা বা কোনো কিছু জমে থাকার মতো অস্বস্তি।
পেটে চর্বি: কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি পাওয়া, বিশেষ করে পেটের চারপাশের চর্বি সহজে না কমা।
মনোযোগের অভাব: লিভারের কার্যকারিতা কমলে শরীরে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ জমে, যা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। ফলে কোনো কিছু সহজে ভুলে যাওয়া বা মনোযোগ দিতে কষ্ট হতে পারে।
ত্বকে কালো ছোপ: ঘাড়, বগল বা কনুইয়ের চামড়া মখমলের মতো কালো হয়ে যাওয়া।
হজম ও রক্তের পরিবর্তন: হালকা বমি বমি ভাব, ক্ষুধা কমে যাওয়া, পেট ফাঁপা এবং রক্ত পরীক্ষায় কোলেস্টেরল বা লিভার এনজাইমের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।
রোগটি মারাত্মক রূপ নিলে চোখ ও ত্বক হলুদ হওয়া (জন্ডিস), পা বা পেটে জল আসা (ফোলাভাব) এবং ঘন ঘন বমি হওয়ার মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়। এমন হলে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণসমূহ
চিনি, মিষ্টি এবং অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাযুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া।
শারীরিক পরিশ্রম না করা বা অলস জীবনযাপন।
শরীরের অতিরিক্ত ওজন বা দ্রুত ওজন বেড়ে যাওয়া।
ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের সমস্যা থাকা। অতিরিক্ত মদ্যপান।
রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষা
সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াও রক্তের কিছু টেস্ট, পেটের আল্ট্রাসাউন্ড এবং লিভারের চর্বির পরিমাণ মাপার জন্য ‘ফাইব্রোস্ক্যান’ করার মাধ্যমে ডাক্তাররা এই রোগ নিশ্চিত করেন।
নিরাময়ের উপায় ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
ফ্যাটি লিভারের কোনো জাদুকরী ওষুধ নেই, তবে নিজের অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ ভালো করা যায়:
ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের অতিরিক্ত ওজন মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলেই লিভারের চর্বি দ্রুত কমতে শুরু করে।
খাবারে পরিবর্তন: দৈনন্দিন খাবার তালিকা থেকে চিনি, কোমল পানীয় ও রিফাইন করা খাবার বাদ দিতে হবে। বেশি করে শাকসবজি, ফলমূল এবং ওটস বা লাল চালের মতো গোটা শস্য খেতে হবে।
নিয়মিত ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের শারীরিক পরিশ্রম বা দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করতে হবে।
নেশা বর্জন: অ্যালকোহল বা মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা পুরোপুরি পরিহার করতে হবে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: রক্তে সুগার ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
আপনার লিভারটি শরীরের জন্য দিনরাত নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই ক্লান্তির মতো ছোটখাটো লক্ষণকে অবহেলা না করে আজই সচেতন হোন এবং সুস্থ জীবনযাপন শুরু করুন।
এফপি/অ