যশোরের কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় পাকা ইরি-বোরো ধান নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। মাঠজুড়ে এখন পানির নিচে তলিয়ে আছে পাকা ধান। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে কৃষককে ধান কাটতে দেখা যাচ্ছে। ধান পড়ে যাওয়ার কারণে ধানে গাছ (কল) চারা বের। ঘনঘন বৃষ্টির কারণে দাঁড়য়ে থাকা ধানগাছেও চারা বের হচ্ছে। আবহাওয়ার বৈরী পরিস্থিতির কারণে সময়মতো ধান ঘরে তুলতে না পারায় অনেক কৃষক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কেশবপুর উপজেলায় ১৩ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের চাষ হয়েছে। গত বছর একই সময়ে চাষ হয়েছিল ১২ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমিতে। সে হিসেবে এবার প্রায় ৬০৫ হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। ভালো ফলনের আশায় কৃষকরা অধিক জমিতে চাষাবাদ করলেও মৌসুমের শেষ সময়ে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা তাদের সেই স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
উপজেলার সাগরদাঁড়ি, সুফলাকাটি, মঙ্গলকোট, পাঁজিয়া, গৌরীঘোনা ও হাসানপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে পানি জমে রয়েছে। অনেক স্থানে ধান কেটে শুকানোর সুযোগ না থাকায় কৃষকরা পানির মধ্যেই ধান মাড়াই করছেন। কোথাও আবার পানিতে পড়ে ধানের শীষ কালো হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
কৃষকরা জানান, কয়েক মাসের পরিশ্রম আর ঋণ করে চাষ করা ধান এখন ঘরে তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। যেসব শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে, তারা জনপ্রতি দৈনিক দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দাবি করছেন। এছাড়া প্রতি বিঘা ধান কেটে বাড়িতে তুলে দিতে আট হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। একই সময়ে উপজেলার প্রায় সব এলাকাতেই ধান কাটা শুরু হওয়ায় শ্রমিক সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজেরাই মাঠে নেমে ধান কাটছেন।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় এমনিতেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তার ওপর অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকট মিলিয়ে এবার ধান ঘরে তোলা কৃষকের জন্য এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অনেক কৃষক বলছেন, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ধানের মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
কেশবপুর উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, ‘এবার উপজেলায় ইরি-বোরো ধানের আবাদ গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। অধিকাংশ জমিতে ভালো ফলনও হয়েছে। তবে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও পানি নিষ্কাশনের ধীরগতির কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনে স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকরা দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পারবেন। কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কেশবপুর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাল ও জলাশয় ভরাট, মাছের ঘের, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রতি বছর কৃষকদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৃষকরা এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। বৃষ্টি থামলে এবং দ্রুত পানি নেমে গেলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি ফিরবে তাদের মনে। অনেকে বলছেন ২/৩ দিন ভাল রোদ হলে ধান দ্রুত ঘরে তোলা যাবে। তবে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে প্রতি বছর একই সময়ে ফসল ঘরে তুতলে হচ্ছে কৃষকদের।
এফপি/অ