শীত এলেই মানুষের মনে ভ্রমণের তাগিদ জাগে। শীত মানেই যেন ঘোরাঘুরির সময়। বছরের শেষ প্রান্তে ডিসেম্বর মাসে স্কুলের পরীক্ষা শেষ হয়, ছুটি নামে শিক্ষার্থীদের জীবনে। সেই সঙ্গে পরিবার, প্রিয়জন কিংবা বন্ধুদের নিয়ে কিছুটা প্রশান্তির খোঁজে মানুষ ছুটে যায় প্রকৃতির কাছে। কুয়াশাভেজা সকাল, নরম রোদ আর সবুজের ছোঁয়ায় শীতকাল মনকে নতুন করে সতেজ করে তোলে। আর এই শীতের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে চা বাগানে।
কুয়াশায় ঢাকা শীতের সকাল, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ আর সবুজ চা গাছের সারি-এমন দৃশ্য যে কাউকেই মুগ্ধ করে। চায়ের রাজ্য বলতে আমাদের মনে প্রথমেই আসে শ্রীমঙ্গলের নাম। দেশের সবচেয়ে বেশি চা বাগান রয়েছে এই শ্রীমঙ্গলে, যার সংখ্যা ৪৪টি। পাহাড়ের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা এই চা অঞ্চল খুব সহজেই ঘুরে দেখা যায়।
শ্রীমঙ্গলের চা বাগানগুলো যেন সবুজের এক বিশাল গালিচা। যেদিকেই চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। মনোমুগ্ধকর এই দৃশ্য মন-প্রাণ ভরে দেয় প্রশান্তিতে। শীতের সকালে কুয়াশামাখা চা বাগানে হাঁটলে মনে হয়, যেন স্বপ্নের কোনো জগতে প্রবেশ করেছি। সবুজ চা পাতার ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দু পাহাড়ের ঢালে ঢালে ছড়িয়ে থাকা চা গাছ-সব মিলিয়ে এক অপার্থিব সৌন্দর্য।
চা বাগানে গেলে চোখে পড়ে চা শ্রমিকদের ব্যস্ততা। কেউ কেউ ঝুড়ি কাঁধে নিয়ে হাতে হাতে চা পাতা সংগ্রহ করছেন। এই দৃশ্য আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়-এক কাপ চা আমাদের হাতে পৌঁছাতে কতটা শ্রম, যত্ন আর ঘাম লুকিয়ে থাকে। প্রকৃতির নীরবতার সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের এই কর্মচাঞ্চল্য যেন চা বাগানের সৌন্দর্যকে আরও গভীর করে তোলে।
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরেই বেশ কয়েকটি চা বাগান অবস্থিত। মাত্র ২০ টাকা রিকশা ভাড়ায় সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় সেখানে। চা বাগানের ভেতরে ছোট ছোট লেক রয়েছে, যা পুরো এলাকার সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ করে দিয়েছে।
শীতকালে চা গাছে ফোটে বিশেষ এক ধরনের ফুল, যা দেখতে সত্যিই অপূর্ব। এই ফুলের নাম ‘ক্যামেলিয়া জাপোনিকা’। চা বাগানে ঢুকলেই মনে হয়, যেন সত্যিই এক চায়ের রাজ্যে এসে পৌঁছেছি। যারা ব্যস্ততার কারণে দূরে কোথাও ভ্রমণে যেতে পারেন না, তাদের জন্য শ্রীমঙ্গল হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। ঢাকা থেকে ট্রেন কিংবা বাসে মাত্র চার ঘণ্টার পথ এই পর্যটন শহর।
চা বাগান শুধু সৌন্দর্যের জায়গাই নয়, এটি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বড় একটি উৎস। চা উৎপাদন দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। চা বাগানে গেলে চা পাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপ দেখার সুযোগ পাওয়া যায়। তবে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া সরাসরি দেখতে হলে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি প্রয়োজন।
শ্রীমঙ্গলে রেল ও সড়কপথে যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ। পর্যটকদের জন্য রয়েছে মানসম্মত থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণে নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘চাঁদের গাড়ি’। ছয় থেকে সাতজন একসঙ্গে এই খোলা গাড়িতে চড়ে শ্রীমঙ্গলের চা বাগানসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে দেখতে পারেন।
সব মিলিয়ে শীতের দিনে প্রকৃতির নীরবতা, সবুজের সমারোহ আর কুয়াশামাখা সকাল উপভোগ করতে চাইলে শ্রীমঙ্গলের চা বাগান হতে পারে নিখুঁত ভ্রমণ গন্তব্য।
এফপি/অ