আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই এবং সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার প্রস্তুতি ও সমন্বয় সক্ষমতা মূল্যায়নের লক্ষ্যে যশোর বিমানবন্দরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি এক্সারসাইজ–২০২৬’।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুর ১২টায় যশোর বিমানবন্দরে এ পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা মহড়া আয়োজন করা হয়।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)-এর Standards and Recommended Practices (SARPs) এবং জাতীয় বেসামরিক বিমান নিরাপত্তা কর্মসূচি (NCASP)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি বিমানবন্দরে প্রতি দুই বছর অন্তর এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি এক্সারসাইজ আয়োজন বাধ্যতামূলক। এরই ধারাবাহিকতায় হাইজ্যাক, বোমা হামলা ও অন্যান্য নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অংশীজনদের সক্ষমতা যাচাই এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে এ মহড়ার আয়োজন করা হয়।
মহড়ার অংশ হিসেবে একটি কাল্পনিক পরিস্থিতির অবতারণা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৭ জানুয়ারি সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা থেকে এয়ার বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নম্বর এয়ার বাংলাদেশ–২৪৭ যশোর বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। উড্ডয়নের প্রায় ১০ মিনিট পর যশোর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপকের কাছে একটি বেনামী টেলিফোন কল আসে, যেখানে কলদাতা বিমানের ভেতরে বোমা রাখা হয়েছে বলে হুমকি দেয়। কোনো অতিরিক্ত তথ্য না দিয়েই কলটি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল টাওয়ারকে জানানো হলে এভিয়েশন সিকিউরিটি ইনচার্জকে অবহিত করা হয় এবং বিমানবন্দরের ফায়ার স্টেশনকে স্ট্যান্ডবাই থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক রিস্ক অ্যাডভাইজরি গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করে ফুল এয়ারপোর্ট ইমার্জেন্সি ঘোষণা করেন এবং ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (ইওসি) সক্রিয় করার নির্দেশ দেন।
ইওসি সক্রিয় হওয়ার পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, এপিবিএন, আনসার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং মেডিকেল ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে দ্রুত অবহিত করা হয়। সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার বিভিন্ন ধাপ বাস্তবায়ন করা হয়, যা মহড়ার বাস্তবতা ও কার্যকারিতা আরও দৃশ্যমান করে তোলে।
এ নিরাপত্তা মহড়ায় বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, এপিবিএন, আনসার, সিভিল সার্জন কার্যালয়, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল টিম এবং বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ একাধিক সংস্থা অংশগ্রহণ করে।
মহড়াটি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান। মহড়ার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল।
মহড়া শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক মহড়ায় অংশগ্রহণকারী সব সংস্থাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এ ধরনের নিরাপত্তা মহড়া সম্ভাব্য দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে যাত্রীসেবায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এ মহড়ার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের সময় বেবিচকসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল এবং একই দিন রাতের মধ্যেই বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা যায়। এ ধরনের মহড়া বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে সহায়তা করবে।
চলতি বছর অনুষ্ঠিতব্য আইকাও নিরাপত্তা অডিটের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি এক্সারসাইজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান তিনি।
এ সময় তিনি যশোর বিমানবন্দরের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বিমানবন্দরের নতুন বহির্গমন টার্মিনাল ভবন ও নতুন এপ্রোন নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান রানওয়ের শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রানওয়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের বিমান নিরাপদভাবে ওঠানামা করতে পারবে।
মহড়ায় বেবিচকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং গণমাধ্যমকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
এফপি/এমআই