চট্টগ্রাম নগরে মশার দাপট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় যেমন বেড়েছে, তেমনি মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে দিনদিন। অথচ নগরবাসীর অভিযোগ—যে সংস্থা এই সংকট মোকাবিলার জন্য দায়ী, সেই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কার্যত উদাসীন। দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, অবহেলা আর অদক্ষতার কারণে সাধারণ মানুষ আজ মৃত্যুঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বাসিন্দারা বলছেন, কর্পোরেশন মশকনিধন কার্যক্রম শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। কোথাও কোথাও ওষুধ ছিটানো হলেও তা নিয়মিত নয়। অনেক সময় কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকা পর্যন্ত কাজ চলে, পরে বন্ধ হয়ে যায়। নগরবাসীর চোখে এটি কেবল অব্যবস্থাপনা নয়, বরং কঠোর অবহেলার নগ্ন উদাহরণ, যেখানে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা হচ্ছে। হামজারবাগ এলাকার গৃহিণী তন্বী পাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁর ছোট্ট শিশুকে নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। মশারি টানলেও বা কয়েল জ্বালালেও কোনো সুরাহা মিলছে না। করপোরেশন যদি সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিত, তাঁদের এমন ভোগান্তি পোহাতে হতো না। একইভাবে হালিশহরের স্কুলশিক্ষিকা ইশরাত জাহান জানান, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাঁকে কয়েকদিন বিছানায় কাতরাতে হয়েছে। তাঁর মতে, এই কষ্টের জন্য দায়ী কেবল করপোরেশনের গাফিলতি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. প্রবল দে বলেন, শুধু ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানো দিয়ে দায় সারলে হবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন যে প্রস্তুতিহীন, তার ফল এখন নগরবাসীকে ভোগ করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে কর্পোরেশন পক্ষ থেকে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দাবি করেছেন, তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তাঁর ভাষায়, নিয়ম করে ওয়ার্ডভিত্তিক রুটিনে স্প্রে করা হচ্ছে, হটস্পট এলাকায় বিশেষ টিম কাজ করছে। সীমিত জনবল ও বাজেটের মধ্যেও নাগরিকদের সুরক্ষায় করপোরেশন দিন-রাত কাজ করছে বলেও তিনি দাবি করেন।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে মশকনিধনের জন্য অন্তত চার শতাধিক কর্মীর প্রয়োজন থাকলেও আছে মাত্র অর্ধেক। বাজেটে বছরে আট–নয় কোটি টাকা ধরা হলেও বাস্তবে বরাদ্দ মেলে তার এক-তৃতীয়াংশ। ফলে যে পরিমাণ ওষুধ দরকার তার অর্ধেকও কেনা যায় না। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকদের অভিযোগ আরও শক্ত হচ্ছে যে, করপোরেশন শুধু দায় এড়াতে জানে, কিন্তু দায়িত্ব নিতে জানে না।
চট্টগ্রামের মানুষ আজ যেভাবে মশার দাপটে অতিষ্ঠ, তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছে—সিটি কর্পোরেশন তাদের মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম আর অবহেলা না থামলে নগরবাসীর জন্য সামনে আরও ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্যঝুঁকি অপেক্ষা করছে। আর এই ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এফপি/অআ