চোখে জল, বুকভরা হাহাকার আর শোকে আচ্ছন্ন এক পরিবার। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ছোট্ট গ্রাম থেকে প্রতিদিন ভেসে আসছে আহাজারির শব্দ। মৃত তরুণটির নাম দুর্জয় চৌধুরী (২৫)। তিনি চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে থানার হাজতে আটক হওয়ার পর ভোরেই মিলল তার নিথর দেহ। পুলিশ বলছে আত্মহত্যা, কিন্তু পরিবার আর এলাকাবাসীর দৃঢ় দাবি- এটা পরিকল্পিত হত্যা।
চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই দুর্জয়ের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খানম ও কয়েকজন সহকারী শিক্ষকের সম্পর্ক ছিলো টানাপোড়েনের। পরিবার দাবি করছে, দুর্জয় বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ নিজের ল্যাপটপে সংরক্ষণ করেছিলেন। আর সেই প্রমাণই হয়ে ওঠে তার মৃত্যুর কারণ।
বাবা কমল চৌধুরী বলেন- আমার ছেলেকে চাকরি থেকে সরানোর জন্য ষড়যন্ত্র চলছিলো অনেকদিন ধরেই। শেষ পর্যন্ত তারা থানার ওসির সঙ্গে যোগসাজশ করে আমার ছেলেকে হত্যা করেছে।
২১ আগস্ট রাতে অভিযোগ ওঠে দুর্জয়ের বিরুদ্ধে। অভিযোগ- চেক জালিয়াতি ও নগদ ২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা আত্মসাৎ। অভিযোগের ভিত্তিতে রাত ১০টার দিকে তাকে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। রাত পেরিয়ে ভোর ৪টায় তার ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায় হাজতে। পুলিশ বলছে আত্মহত্যা, কিন্তু পরিবারের দাবি—ওসি, এএসআই ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের আঁতাতেই তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
এদিকে, এ ঘটনার পাঁচ দিন পর, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাবার পক্ষ থেকে থানায় এজাহার দায়ের করা হয়। এজাহারে নাম এসেছে থানার সাবেক ওসি শফিকুল ইসলাম, এএসআই হানিফ মিয়া, দুই কনস্টেবল, প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খানম, দুই সহকারী শিক্ষক ও এক অফিস সহায়কের।
এজাহারের সময় কক্সবাজার জেলা জজ আদালতের ১০-১২ জন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। তবে এখনো সেটি মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি।
জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট পিন্টু বড়ুয়া বলেন, “থানা হাজতে মৃত্যু কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আমরা যদি ন্যায়বিচার না পাই, আদালতের শরণাপন্ন হবো। পাশাপাশি বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই।”
চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অভিজিৎ দাস বলেন, দুর্জয়ের বাবা থানায় এজাহার দিয়েছেন। যেহেতু এর আগে অপমৃত্যু মামলা হয়েছে, বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত এএসআই, দুই কনস্টেবল এবং ওসিকে প্রত্যাহার করেছে পুলিশ প্রশাসন। সেইসাথে প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খানমকেও ওএসডি করে শিক্ষা অধিদপ্তরে ন্যস্ত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় পুলিশ এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
দুর্জয়ের গ্রামের বাড়িতে এখন শুধু শোকের মাতম। মা প্রতিটি আগন্তুককে বুক ভরা কান্নায় বলছেন, “আমার ছেলেকে তারা খুন করেছে। ও কখনো আত্মহত্যা করতে পারে না।”
এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “একজন নিরপরাধ তরুণকে থানার ভেতরে হত্যা—এটা ন্যায়বিচারের চরম অপমান। দায়ীদের শাস্তি না হলে মানুষের পুলিশের প্রতি আস্থা থাকবে না।”
অপরদিকে, মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, থানায় আটক অবস্থায় কারো মৃত্যু হলে সেটার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ অনুযায়ীও গুরুতর অপরাধ। বিচার বিভাগীয় তদন্ত ছাড়া এ ঘটনায় সত্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। দুর্জয় সত্যিই আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তিনি দুর্নীতির প্রমাণের বোঝা বয়ে বেড়ানো এক অকালপ্রয়াত বলি, এখন সেটি নির্ভর করছে তদন্ত ও বিচারের ওপর। এলাকাজুড়ে এখন শুধু একটি প্রশ্ন- ন্যায়বিচার কি মিলবে, নাকি আরও এক থানা হাজতের মৃত্যু চাপা পড়ে যাবে প্রশাসনিক ফাইলে?
এফপি/রাজ