মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী থানায় জব্দ করা দুটি ব্যাটারিচালিত রিকশা ছাড়িয়ে নিতে পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা টাকা না দেওয়ায় বাবা-ছেলেকে চুরির মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।
এ ছাড়া পুলিশের টাকা দাবির কথোপকথন মুঠোফোনে গোপনে ধারণ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ সদস্যরা তাঁদের তিনটি মুঠোফোন এবং গ্যারেজের সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক নিয়ে গেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সফিউদ্দিন আহমেদ মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী মো. শাহজাহান শেখের মেয়ে সায়মা আক্তার। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জব্দ করা সাইকেল ফেরত এবং পুলিশের নিয়ে যাওয়া মুঠোফোন ও সিসিটিভির হার্ডডিস্ক উদ্ধারের দাবি জানান।
এর আগে গত ২৩ অক্টোবর টঙ্গিবাড়ী থানা-পুলিশ জানায়, চোরাই বাইসাইকেল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. শাহজাহান শেখ ওরফে শাহজাহান মুন্সী (৬৫) এবং তাঁর বড় ছেলে মো. শামীম শেখকে (২৮) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা উপজেলার আড়িয়ল ইউনিয়নের বিলের পাড় সানবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। এ সময় শাহজাহান মুন্সীর গোডাউন থেকে ৪২টি বাইসাইকেল ও দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা উদ্ধারের কথাও জানায় পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সায়মা আক্তার বলেন, গত ১৯ অক্টোবর বালিগাঁও বাজারের ভ্যানচালক শাহীন তাঁর বেয়াই ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে তাঁদের বাবার গ্যারেজে আসেন। এ সময় শাহীন দুটি ব্যাটারিচালিত রিকশা বিক্রির প্রস্তাব দেন। প্রথমে তাঁর বাবা রাজি না হলেও পরে শাহীন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা রিকশা দুটি ছয় মাস আগে কেনা হয়েছে বলে দাবি করেন। চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন থাকায় তাঁর বাবা রিকশা দুটি কিনতে সম্মত হন। পরে ৩০ হাজার টাকা দাম নির্ধারণ হলে ১৯ অক্টোবর ২৫ হাজার এবং ২২ অক্টোবর বাকি পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।
সায়মার অভিযোগ, ২২ অক্টোবর দুপুরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁদের বাবার গ্যারেজে গিয়ে তালা খুলতে চাপ দেন। একপর্যায়ে গ্যারেজ খুলে তাঁরা দুটি রিকশা নিয়ে যান। এ সময় তাঁর ভাইকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। গ্যারেজে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরায় পুরো ঘটনার দৃশ্য ধারণ হলেও পরে পুলিশ সদস্যরা ক্যামেরা ভেঙে হার্ডডিস্ক নিয়ে যান বলে দাবি করেন সায়মা।
তিনি আরও বলেন, ওই দিন সন্ধ্যায় রিকশা দুটি ছাড়িয়ে নিতে তাঁর বাবা ও ভাইকে ফোন করে থানায় ডেকে নেওয়া হয়। তাঁরা টঙ্গিবাড়ী থানায় গেলে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ওসমান আলীসহ আরও দুজন পুলিশ সদস্য তাঁর বাবার কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে রিকশা আটকে রাখা এবং বাবা-ছেলেকে চুরির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সায়মার ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে তাঁর বাবা ৫০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। এ সময় তাঁর ভাই গোপনে নিজের মুঠোফোনে পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনের কিছু অংশ ধারণ করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে পুলিশ সদস্যরা ক্ষুব্ধ হন। পরে ৫০ হাজার টাকা না নিয়ে তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে দুটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও বিকাশ লেনদেনে ব্যবহৃত একটি বাটন ফোনসহ মোট তিনটি মুঠোফোন নিয়ে নেওয়া হয়।
সায়মা জানান, ওই দিন রাত ১০টার পরও তাঁর বাবা ও ভাই বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তাঁদের খোঁজ নিতে গ্যারেজে যান। পরে জানতে পারেন, তাঁদের থানায় আটকে রাখা হয়েছে। রাত ১২টার দিকে পুলিশ তাঁর ভাইকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে তাঁদের বাবার গ্যারেজ থেকে ৪২টি সাইকেল নিয়ে যায়।
সায়মার দাবি, উদ্ধার করা সাইকেলগুলো তাঁর বাবা বিভিন্ন সময়ে মানুষের কাছ থেকে কিনে মেরামতের জন্য গ্যারেজে রাখতেন। কিছু সাইকেল নিজেও কিনেছিলেন। মেরামত শেষে সেগুলো ভাড়ায় চালানোর জন্য দেওয়া হতো। এটি তাঁদের বাবার বৈধ ব্যবসার অংশ। অথচ সাইকেলগুলো চোরাই মালামাল হিসেবে দেখিয়ে তাঁর বাবাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গিবাড়ী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আব্দুর রহিম মোল্লার বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ তোলেন সায়মা। তিনি বলেন, তাঁর ভাইয়ের মুঠোফোন ফেরত চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা নানা টালবাহানা করছেন এবং তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন। রিমান্ড থেকে রক্ষা করতে বালিগাঁও ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কামাল হোসেন খানের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ওই ইউপি সদস্য তাঁদের জানিয়েছেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য পুলিশ তাঁকে বারবার ফোন দিচ্ছে।
সায়মা বলেন, তাঁর বাবা ও ভাইয়ের আলাদা ব্যবসা রয়েছে। অথচ তাঁর ভাইকে বাবার ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখিয়ে মামলায় জড়ানো হয়েছে। রিকশা কেনার বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তাঁদের পরিবারের ওপর এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি করা হলো, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সায়মা বলেন, 'যাঁরা আইনের পথ দেখাবেন, তাঁরা যদি টাকার জন্য আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে আমরা কোথায় যাব? আজ সংবাদ সম্মেলন করে যাওয়ার পর আমাদের সঙ্গে কী হবে, জানি না। তবে আমরা সব ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।'
তিনি আরও বলেন, তাঁর বাবা ও ভাইয়ের কাছ থেকে নেওয়া তিনটি মুঠোফোন এবং গ্যারেজের সিসিটিভির হার্ডডিস্ক উদ্ধার করতে হবে। হার্ডডিস্কের কোনো ভিডিও যেন মুছে ফেলা না হয়। ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করলেই তাঁদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা টাকা দাবির অভিযোগ তদন্ত, মামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জব্দ করা সাইকেলগুলো ফেরত দেওয়ার দাবি জানান।
এ বিষয়ে বালিগাঁও ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কামাল হোসেন খান টাকা চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে, টাকা দাবি ও হয়রানিমূলক মামলা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিদর্শক (এসআই) ওসমান আলী বলেন, 'টাকা কে চেয়েছে, এমন বিষয় তিনি জানেন না। তবে ভালো কাজ করলে বদনাম হয়। আমাকে জড়ানো হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. কামরান হোসেন বলেন, 'মামলার বিষয়টি তদন্তাধীন ছিল। যেহেতু গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ এসেছে, সেটিও আমরা আমলে নিচ্ছি। তদন্তে যদি পুলিশের কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এফপি/মিব