Dhaka, Wednesday | 21 October 2026
         
English Edition
   
Epaper | Wednesday | 21 October 2026 | English
শিরোনাম:

তুরস্কের সংসদে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি, কী আছে এর ১৬ অনুচ্ছেদে?

প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫০ পিএম আপডেট: ২১.১০.২০২৬ ৩:০৬ পিএম  (ভিজিটর : ৬)
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ্যে এসেছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চুক্তির পাঠ অনুমোদনের জন্য তুরস্কের সংসদে জমা দিয়েছে দেশটির সরকার। ১৬টি অনুচ্ছেদে গঠিত এ চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা, সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে।

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় স্বাক্ষরিত এ চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, কোনো সদস্য দেশের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আক্রান্ত দেশকে অন্য সদস্যরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা দেবে। এর মধ্যে সামরিক সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে সহায়তার ধরন ও পরিধি প্রয়োজনের মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করেছে। চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে সরাসরি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বরং সদস্য দেশগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পারস্পরিক প্রতিরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে সদস্য দেশগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের সুরক্ষায় সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কোনো সদস্য দেশের এসব বিষয়ে হুমকি বা বিপদ দেখা দিলে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। অন্য কোনো দেশ বা একাধিক দেশের সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে আক্রান্ত দেশকে অবিলম্বে সহায়তা দেবে অন্য সদস্যরা।

জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের বিষয়টিও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে সহায়তার ধরন ও পরিধি নির্ধারণ করা হবে প্রয়োজনের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে এবং সদস্য দেশগুলোর বিদ্যমান সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে।

পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে এ চুক্তির সঙ্গে ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদের নীতিগত মিল রয়েছে। তবে দুই ব্যবস্থার আইনি কাঠামো ও বাস্তবায়নপদ্ধতি এক নয়। 

প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহযোগিতা
চুক্তির তৃতীয় থেকে সপ্তম অনুচ্ছেদে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
এতে তিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন, যৌথ প্রশিক্ষণ, সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের পারস্পরিক বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ ও শান্তিকাল—উভয় সময়েই এসব কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকবে।

প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নে প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা, নতুন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা শিল্পের কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সামরিক গবেষণা ও উন্নয়নে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তিন দেশ সহযোগিতা বাড়াবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত পরামর্শ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

নবম অনুচ্ছেদে নিরাপদ মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গোপনীয় তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্যের সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের সুযোগ

চুক্তির দশম অনুচ্ছেদে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম ও সরবরাহসংক্রান্ত সহযোগিতার বিধান রাখা হয়েছে।

এ অনুযায়ী, সরবরাহব্যবস্থার প্রাপ্যতা ও সামঞ্জস্যের শর্তে দেশগুলো একে অন্যকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে। এ সহযোগিতা শান্তিকাল, যুদ্ধকাল এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতেও কার্যকর হতে পারে।

চুক্তির একাদশ থেকে ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে আইনি ব্যবস্থা, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে সদস্য দেশগুলোর অধিকার ও বাধ্যবাধকতা এবং গোপনীয় তথ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষ করে, চুক্তির আওতায় পাওয়া শ্রেণিবদ্ধ তথ্য ও নথি সদস্য দেশগুলোর বাইরের কোনো রাষ্ট্র, কোম্পানি বা ব্যক্তির সঙ্গে বিনিময় করা যাবে না। এসব তথ্য ব্যবহারের সুযোগও কেবল প্রয়োজন ও যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়পত্রের ভিত্তিতে দেওয়া হবে।

গঠিত হবে কৌশলগত প্রতিরক্ষা কমিটি
চুক্তির অষ্টম অনুচ্ছেদে ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন।

কমিটির দায়িত্ব হবে যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পথে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করা।

কমিটি বছরে দুবার বৈঠক করবে। তিন দেশ পালাক্রমে এসব বৈঠকের আয়োজন করবে। প্রয়োজন মনে করলে দেশগুলোর নেতারা বছরে একবার বৈঠকে বসতে পারবেন। এ ছাড়া কমিটির অধীনে উপকমিটি গঠনের সুযোগও রাখা হয়েছে।

চুক্তির আওতায় অন্য কোনো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ও নীতিমালা নির্ধারণের ক্ষমতাও থাকবে কমিটির। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশের সর্বসম্মতি প্রয়োজন হবে।

কমিটির কার্যক্রমে সহায়তার জন্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। সচিবালয়ের মহাসচিব তিন দেশের মধ্য থেকে পালাক্রমে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন। প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের নাগরিক।

১০ বছর পর প্রত্যাহারের সুযোগ
চুক্তির ১৪ ও ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং চুক্তি সংশোধনের নিয়ম উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির ব্যাখ্যা বা বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তা বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সমাধান করতে হবে। আর চুক্তিতে সংশোধন আনতে হলে প্রতিষ্ঠাতা তিন দেশের মধ্যে আলোচনা ও সর্বসম্মতি প্রয়োজন হবে।

১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, চুক্তিটি অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১০ বছর কোনো সদস্য দেশ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করতে পারবে না।

১০ বছর পার হলে কোনো দেশ চুক্তি থেকে সরে যেতে চাইলে কূটনৈতিক মাধ্যমে অন্য সদস্য দেশগুলোকে অন্তত তিন মাস আগে লিখিতভাবে জানাতে হবে।

চুক্তি থেকে কোনো দেশ প্রত্যাহার করলেও তার আগে সম্মত হওয়া চলমান কার্যক্রম ও প্রকল্পের ওপর এর প্রভাব পড়বে না। একইভাবে, গোপনীয় তথ্য ও নথির সুরক্ষা-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতাও চুক্তির অবসান বা প্রত্যাহারের পর বহাল থাকবে।

চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার জন্য তিন দেশের নিজ নিজ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির সচিবালয়ে অনুমোদনের সর্বশেষ দলিল জমা দেওয়ার তারিখ থেকে এটি কার্যকর হবে।

তুর্কি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় চুক্তিটির তিনটি মূল কপি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনটি ভাষার পাঠই সমানভাবে প্রামাণ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য দেখা দিলে ইংরেজি পাঠকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

তিন দেশের এ উদ্যোগ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি পদক্ষেপ। তবে চুক্তির বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে এর অনুমোদন, বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার ওপর।

এফপি/মিব
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝