প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন সম্ভাবনাময় খাতের দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মুক্তাদির আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেছেন, আসিয়ান অঞ্চলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘আসিয়ান অঞ্চলে হালাল ইকোসিস্টেম: বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, হালাল অর্থনীতিকে এখন আর শুধু খাদ্য ও পানীয় খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। বর্তমানে এটি খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, মোডেস্ট ফ্যাশন, পর্যটন, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বৃহৎ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রপ্তানি বাড়াতে হলে প্রথমেই উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
এর জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।’
এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যেন বাংলাদেশের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পায়।
খন্দকার মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক হালাল বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে দেশে একটি স্বাধীন, নির্ভরযোগ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়বে এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পকেন্দ্রিক হলেও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাণিজ্যে টিকে থাকতে পণ্য ও বাজার—উভয় ক্ষেত্রেই বহুমুখীকরণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে হালাল অর্থনীতি নতুন সম্ভাবনার একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে।
তারা বলেন, বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
খাদ্যের পাশাপাশি ওষুধ, প্রসাধনী, ফ্যাশন, পর্যটন এবং জীবনধারাভিত্তিক বিভিন্ন পণ্যে হালাল মানের গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বাজারে কার্যকরভাবে প্রবেশ করতে হলে সমন্বিত উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আলোচনায় মালয়েশিয়ার হালাল ইকোসিস্টেমকে বাংলাদেশের জন্য অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, মালয়েশিয়া হালালকে কেবল একটি পণ্য বা সনদ হিসেবে দেখেনি; বরং উৎপাদন, গবেষণা, সার্টিফিকেশন, বিপণন ও রপ্তানিকে সমন্বিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দিয়েছে।
বক্তাদের মতে, বাংলাদেশের রয়েছে বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, শক্তিশালী কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ওষুধ শিল্প, চামড়া শিল্প এবং পোশাক খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। এসব সক্ষমতাকে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক হালাল সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হতে পারে।
সেমিনারে বাংলাদেশের হালাল খাতকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করতে পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য জাতীয় হালাল নিশ্চয়তা কাঠামো গড়ে তোলা, আধুনিক পরীক্ষাগার ও উন্নত লজিস্টিক সুবিধাসহ বিশেষায়িত হালাল শিল্প ক্লাস্টার প্রতিষ্ঠা, বিদ্যমান উৎপাদন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, এসএমই ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ হালাল ব্র্যান্ড’কে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠা করা।
বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রেদওয়ানুর রহমান স্বাগত বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সার্টিফিকেশন (লাইভস্টক) বিভাগের উপপরিচালক আকতার হোসেন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) উপপরিচালক (হালাল সার্টিফিকেশন) এস এম আবু সাঈদ।
বক্তারা বলেন, ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি পণ্যের মান, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা নিশ্চিত করা গেলে হালাল অর্থনীতি বাংলাদেশের রপ্তানির নতুন ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একটি কার্যকর হালাল ইকোসিস্টেম। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু হালাল পণ্য রপ্তানিকারক নয়, বৈশ্বিক হালাল বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
এফপি/র