নওগাঁর মান্দায় অভিনব কায়দায় জিম্মি করে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ, সর্বস্ব লুট ও জোরপূর্বক ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগে এক সংঘবদ্ধ ব্ল্যাকমেইলিং ও 'হানিট্রাপ' চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এক সরকারি কর্মচারী ও এক ব্যবসায়ীর দায়ের করা পৃথক দুটি মামলায় গ্রেফতারকৃতদের সোমবার (১০ আগস্ট) আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন, উপজেলার বড়পই গ্রামের তানজিমা খাতুন (৪৪), কুসুম্বা মোড় এলাকার শ্রী কনক কুমার (৩০) এবং কুসুম্বা (দক্ষিণপাড়া) গ্রামের মোঃ সাজ্জাদ হোসেন (২৮)।
পুলিশ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, মান্দা উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের কার্যসহকারী মোঃ আলমগীর হোসেনকে দাপ্তরিক কাজের অসিলায় দীর্ঘদিন ধরে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে আসছিলেন চক্রের নারী সদস্য তানজিমা খাতুন। গত ৭ আগস্ট রাতে তিনি ফোন করে আলমগীরের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কথামতো পরদিন ৮ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আলমগীর কুসুম্বা মসজিদ এলাকায় যান। সেখানে পৌঁছালে তানজিমার সহযোগী কনক কুমার ও সাজ্জাদ হোসেনসহ কয়েকজন দুষ্কৃতকারী কৌশলে তাকে একটি টিনশেড ঘরে নিয়ে যান। সেখানে চা ও সিগারেটের সঙ্গে চেতনানাশক বা নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে তাকে কাবু করা হয়।
পরে পাশের একটি মাটির ঘরে নিয়ে তানজিমা খাতুনকে দিয়ে আলমগীরকে জড়িয়ে ধরিয়ে জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চক্রটি। আসামিরা ভুক্তভোগীর মানিব্যাগ থেকে নগদ ৬ হাজার ৭০০ টাকা এবং বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে ৫ হাজার ২ শত টাকা বের করে নেয়। একপর্যায়ে মান-সম্মানের ভয়ে ভুক্তভোগী ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন এবং স্বজনের মাধ্যমে ব্যাংক চেকের বই আনান। আসামিরা চাপ সৃষ্টি করে ওই টাকার একটি চেক, একটি ফাঁকা চেক এবং ১০০ টাকা মূল্যমানের ৩টি ফাঁকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেয়।
গত রোববার (৯ আগস্ট) সকাল পৌনে ১১টার দিকে আসামিরা অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি সতীহাট শাখা থেকে ওই চেক দিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করতে যায়। ভুক্তভোগী আলমগীরের মাধ্যমে এই সংবাদ পেয়ে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় মান্দা থানা পুলিশ ব্যাংকে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে কনক কুমার ও সাজ্জাদ হোসেনকে আটক করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সহযোগী সুমন ও ইসরাফিল পালিয়ে যায়। পুলিশ ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার থেকে ভুক্তভোগীর জমাকৃত চেকটি উদ্ধার ও জব্দ করে। পরবর্তীতে পুলিশের অপর এক অভিযানে ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের মূল হোতা তানজিমা খাতুনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে মান্দা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
এদিকে, একই চক্রের নিষ্ঠুর শিকার হয়েছেন মোঃ ফায়জুল মোল্লা (৪৮) নামের স্থানীয় এক ব্যবসায়ী। গত ৭ আগস্ট বিকেলে কুসুম্বা মোড় থেকে পাওনা টাকা আদায়ের কথা বলে কনক কুমার তাকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যান। পথিমধ্যে কৌশলে নেশাজাতীয় কোমল পানীয় খাইয়ে তাকে বাদলঘাটা গ্রামে আটকে রাখা হয়। সেখানে এক অজ্ঞাত নারীর সঙ্গে তাকে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা চালানো হয়। এতে রাজি না হওয়ায় ফায়জুলকে বেধড়ক মারধর করে বিবস্ত্র করা হয় এবং কনক কুমার মোবাইল ফোনে ৩/৪ মিনিটের একটি ভিডিও ধারণ করেন।
পরে চক্রের আরেক সদস্য মাজন ডাক্তার ওই ঘরে প্রবেশ করে ভিডিও ভাইরালের ভয় দেখিয়ে ৪ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। মারধর ও প্রাণনাশের হুমকিতে নিরুপায় হয়ে ফায়জুল তার স্ত্রীর মাধ্যমে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ৬০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে ওই রাতেই মাজন ডাক্তারের হাতে তুলে দেন। এরপরও আসামিরা আরও ২ লাখ টাকা দাবি করে ৩টি ফাঁকা নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে ফায়জুলের স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ফায়জুল মোল্লা বাদী হয়ে ৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২/৩ জনকে আসামি করে মান্দা থানায় পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেন।
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, জেলা পুলিশ সুপারের সঠিক নির্দেশনায় ও দ্রুত পদক্ষেপে ব্যাংক থেকে হাতেনাতে দুই আসামিকে আটক এবং পরবর্তীতে মূল নারী আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। পৃথক দুটি ঘটনার প্রেক্ষিতে থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আটক ৩ আসামিকে গ্রেফতার দেখিয়ে সোমবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এই চক্রের অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করতে পুলিশের একাধিক দল চিরুনি অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
এফপি/অ