একসময় মনে করা হতো, ধূমপানের ক্ষতি মানেই ফুসফুস নষ্ট হওয়া, শ্বাসকষ্ট, হার্ট অ্যাটাক বা ক্যান্সারের ঝুঁকি। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন আরো ভয়াবহ এক বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলছে।
সিগারেটের ধোঁয়া শুধু শ্বাসনালীতেই নয়, নিঃশব্দে আঘাত হানছে মানুষের হাড়, গাঁট ও চলাফেরার সক্ষমতার ওপরও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের ধূমপান শরীরে এমন এক জটিল প্রতিরোধ ব্যবস্থার গোলযোগ তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (RA) বা মারাত্মক বাতের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ভারতীয় গণমাধ্যম এই সময়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই রোগ একসময় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, এমনকি দৈনন্দিন ছোট ছোট কাজ করার ক্ষমতাও কেড়ে নিতে পারে।
যখন শরীর নিজেকেই আক্রমণ করে
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি অটোইমিউন রোগ।
অর্থাৎ, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাইরের ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বদলে নিজের সুস্থ জয়েন্ট ও টিস্যুকেই শত্রু ভেবে আক্রমণ করতে শুরু করে।
চিকিৎসকদের ভাষায়, ধূমপানের ক্ষতিকর রাসায়নিক ফুসফুসে প্রবেশ করার পর শরীরে এক ধরনের অস্বাভাবিক প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তখন শরীরে ‘রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর’ (RF) এবং ‘অ্যান্টি-সিসিপি’ (Anti-CCP)-র মতো ক্ষতিকর অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে জয়েন্টে ব্যথা শুরু হওয়ার বহু বছর আগেই এই উপাদানগুলো রক্তে জমা হতে থাকে।
অর্থাৎ, রোগ শরীরের ভেতরে নিরবে বাসা বাঁধলেও মানুষ তা টেরই পান না।
বংশগত ঝুঁকি থাকলে বিপদ আরো বেশি
যাদের পরিবারে আগে থেকেই বাত বা অন্য কোনো অটোইমিউন রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের জন্য ধূমপান যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিনগত ঝুঁকি থাকা ব্যক্তিদের শরীরে ধূমপান রোগটিকে দ্রুত সক্রিয় করে দিতে পারে।
ফলে তুলনামূলক কম বয়সেও অনেক ধূমপায়ী হঠাৎ জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা বা অস্বাভাবিক শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভুগতে শুরু করেন।
যেসব লক্ষণকে অবহেলা করা বিপজ্জনক
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের শুরুটা অনেক সময় খুব সাধারণ উপসর্গ দিয়ে হয়।
তাই অধিকাংশ মানুষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। বিশেষ করে তরুণ ধূমপায়ীরা ভাবেন, বাতের রোগ কেবল বৃদ্ধ বয়সেই হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
চিকিৎসকদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো নিয়মিত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—
সকালে ঘুম থেকে উঠে গাঁট শক্ত হয়ে থাকা
ঘুম থেকে ওঠার পর অন্তত আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে হাত-পা বা জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকলে তা সতর্ক সংকেত হতে পারে
দুই হাত বা দুই পায়েই একই ধরনের ব্যথা
আঙুল, কব্জি, হাঁটু বা পায়ের গাঁটে একসঙ্গে ব্যথা বা ফোলা দেখা দেওয়া RA-এর অন্যতম সাধারণ লক্ষণ
জয়েন্ট গরম হয়ে যাওয়া
গাঁটের চারপাশে অস্বাভাবিক উষ্ণতা, লালচে ভাব বা ফোলা দেখা দিলে তা শরীরের প্রদাহজনিত সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে
ছোট কাজ করতেও কষ্ট হওয়া
চায়ের কাপ ধরা, বোতলের ঢাকনা খোলা কিংবা মোবাইল ধরে রাখার মতো সাধারণ কাজেও অসুবিধা হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
ঝুঁকিতে পরিবারের সদস্যরাও
ধূমপানের ক্ষতি কেবল সিগারেট হাতে থাকা ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। গবেষণা বলছে, ঘরের ভেতরে ধূমপানের ধোঁয়া শিশুদের শরীরেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করতে পারে।
আমেরিকার National Institutes of Health (NIH)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারী শৈশবে বাবা-মায়ের ধূমপানের কারণে নিয়মিত ‘প্যাসিভ স্মোকিং’-এর শিকার হয়েছেন, পরবর্তী জীবনে তাঁদের রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
অর্থাৎ, পরিবারের একজনের ধূমপান অজান্তেই অন্য সদস্যদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
কেন এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কেবল ব্যথার রোগ নয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি ধীরে ধীরে জয়েন্ট বিকৃত করে দিতে পারে, চলাফেরা সীমিত করে ফেলতে পারে, এমনকি কর্মক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ধূমপান ছাড়ার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সিগারেট হয়তো মুহূর্তের স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সেই ধোঁয়ার আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে আজীবনের বাতের যন্ত্রণা।
এফপি/অ