যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের যে ঘোষণা দিয়েছে, তা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের রফতানির ৭৬ শতাংশ, এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ঝুঁকিতে
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে—২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ১৮-১৯ শতাংশ। এই খাতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে এক লাফে ৩৭ শতাংশে উঠে যাওয়ায় প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে গড়ে ৩-৪ ডলার পর্যন্ত। ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। যা সরাসরি অর্ডার কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
প্রতিযোগীদের সুবিধা
যদিও মেক্সিকো ছাড়া সব দেশই এই শুল্কের আওতায় এসেছে, তবুও ভারত (২৬%) ও পাকিস্তান (২৯%) এর তুলনায় বাংলাদেশ বেশি চাপে পড়েছে। আবার হন্ডুরাস, মিসর ও তুরস্কের মতো কিছু দেশ ভৌগোলিক সুবিধা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তির কারণে নতুন প্রতিযোগী হয়ে উঠছে।
ক্রেতার চাহিদা ও অর্ডার কমার শঙ্কা
মার্কিন ক্রেতারা দাম বৃদ্ধির কারণে অর্ডার কমাতে পারেন কিংবা সস্তা উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ক্রেতারা নতুন অর্ডারের দর কমানোর চাপ দিতে পারেন বা পুরোনো অর্ডারের দাম পুনর্মূল্যায়নের দাবি তুলতে পারেন।
অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। টিকফা (TICFA) চুক্তির আওতায় আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক পুনর্বিবেচনা করানোর চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামোও পর্যালোচনা করে ‘বার্গেনিং টুল’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা
এই শুল্ক শুধু বাংলাদেশের ওপরই নয়, চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশের ওপরই আরোপ হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাখ্যা যে পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর ৭৪% শুল্কের প্রতিক্রিয়া—তা বাস্তব তথ্য দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কেননা বাংলাদেশ মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্ক্র্যাপ, কটন ও জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার ওপর শুল্ক খুবই কম বা নেই।
স্বস্তির দিক
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, ফলে নিজস্ব ভোক্তারা শুল্ক নিয়ে অসন্তোষ জানাতে পারে।
বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপরও উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ হওয়ায় ‘level playing field’ পুরোপুরি নষ্ট হয়নি।
অতীতে কোটাপ্রথা বাতিলের পরও বাংলাদেশ সফলভাবে মানিয়ে নিয়েছিল। সেই সক্ষমতা এখনো আছে।
এই শুল্ক বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক এবং মধ্যমেয়াদি একটি বড় চাপ। তবে এটি মোকাবেলার উপায়ও রয়েছে:
১. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা,
২. নতুন বাজার খোঁজা ও রফতানি বৈচিত্র্যকরণ,
৩. উৎপাদন খরচ কমিয়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখা।
এখন সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার, কারণ দেরি হলে রফতানি হারানো শুধু আশঙ্কা নয়, বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে।
এফপি/রাজ