ফাল্গুনের আলো বরিশালে একটু আলাদা। নদীর জল তখন আর ঠিক জল থাকে না; সবুজের ভেতর মিশে যায় নীলাভ বিষণ্নতা। এই আলোতেই, এই বাতাসেই, ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন জীবনানন্দ দাশ। আজ কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী।
জন্মসন নিয়ে একসময় বিতর্ক থাকলেও এখন গবেষকদের বড় অংশ একমত, ১৮৯৯ সালের এই দিনেই বরিশালে তাঁর জন্ম। কবি নিজেই লিখেছিলেন, ‘আমার জন্ম হয়েছিল বরিশালে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ফাল্গুন মাসে।’ কবির ছোট ভাই আশোকানন্দ দাশও পরে একই তথ্য জানান। এই জন্ম শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বরিশাল শহরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তাই বরিশালকে শুধু একটি শহর বললে কম বলা হয়। এই শহর যেন এক কবিতার ঠিকানা। বরিশাল বহু আগেই কবিদের চোখে পড়েছিল। ১৯০৬ সালের ১৫ এপ্রিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বজরা এসে ভিড়েছিল কীর্তনখোলা নদীর ঘাটে।
নদী, খাল-বিল আর অবারিত সবুজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। পরে কাজী নজরুল ইসলাম এই শহরকে বলেছিলেন ‘বাংলার ভেনিস’। কিন্তু বরিশালের প্রকৃতি যাঁর ভেতরে সবচেয়ে নিঃশব্দে, সবচেয়ে গভীরভাবে ঢুকে পড়েছিল, তিনি জীবনানন্দ।
বরিশালের গাছপালার ফাঁক দিয়ে যে আলো নামে, পাখির ডানার শব্দে যে বিষণ্নতা ভাসে- জীবনানন্দ সেই দৃশ্যের কবি। তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী মানুষ, বিকেলের ক্লান্ত আকাশ, ধানসিড়ির জল।
এসবই বরিশালের রূপান্তরিত ভাষা। যে ভাষা ঘুরেফিরে বারবার এসেছে কবির কবিতায়। তাই তো বলা যায়-বরিশালের জীবনানন্দ দাশ, কিংবা জীবনানন্দের বরিশাল।
শেকড়, পরিবার আর ব্রাহ্ম সমাজ
জীবনানন্দের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ঢাকার বিক্রমপুর অঞ্চলের মানুষ। পদ্মার ভাঙনে সেই গ্রাম হারিয়ে গেলেও পরিবারটির নতুন অধ্যায় শুরু হয় বরিশালে। অর্থাৎ জীবনানন্দের শেকড় ছিল বিক্রমপুরে, কিন্তু তাঁর আত্মার বাসা গড়ে উঠেছিল বরিশালে।
কবির পিতামহ সর্বানন্দ দাশের হাত ধরে এই শহরে আসা পরিবারটির। সর্বানন্দ দাশ বরিশালে এসে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। ১৮৬১ সালে বরিশাল ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হন তিনি। তাঁরা হাসপাতাল রোড ও কালীবাড়ি রোডের মাঝামাঝি এলাকায়, মহাত্মা অশ্বিনী দত্তের বাড়ির উল্টো দিকে ব্যারিস্টার এন গুপ্তের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। বাড়িটি একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাতা নগেন গাঙ্গুগুলিদের বাড়ি হিসেবেও পরিচিত ছিল।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ এই বাড়ির প্রশস্ত অটচালার একটি ঘরেই জন্মেছিলেন। ঘরটি ছিল শান্ত, খানিক নির্জন। গবেষকরা লিখেছেন, সেখানেই জন্ম নিয়েছিল এক নিঃশব্দ আধুনিকতা। ব্রাহ্ম সমাজ, শিক্ষার আলো, বইয়ের গন্ধ-এই সবের মাঝেই কবির শৈশব।
জীবনানন্দ গবেষক কবি হেনরী স্বপন বলেন, পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক এবং ব্রাহ্ম সমাজের সক্রিয় কর্মী। ব্রজমোহন (বিএম) স্কুলে শিক্ষকতা, ‘ব্রাহ্মবাদী’ পত্রিকার সম্পাদনা- এইসব মিলিয়ে পরিবারে চিন্তা ও মননের এক ঘন পরিবেশ ছিল। সেই পরিবেশেই বেড়ে উঠেছিলেন কবি।
সর্বানন্দভবন থেকে ধানসিঁড়ি
শৈশবের প্রথম বছরগুলো কাটানোর পর জীবনানন্দের পরিবার স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন বগুড়া রোডে। ১৯০৭ সালে নির্মিত সেই বাড়ির নাম দেওয়া হয় সর্বানন্দভবন। আট বছর বয়স থেকে এই বাড়িতেই কবির বেড়ে ওঠা।
জীবনানন্দ দাশের ছাত্র আবুল কালাম শামসুদ্দিন লিখেছেন, বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ঘরের ভেতর ছিল ‘বই, বই আর বই’।
হেনরী স্বপনের ভাষ্যমতে,আট বছর বয়স থেকে যে বাড়িতে জীবনানন্দের দিন কাটে, সেখানে বাইরে ছিল সাধারণ ঘর, ভেতরে বইয়ের অরণ্য। দেশভাগ সেই নির্জনতার ছেদ টেনে দেয়। দাঙ্গার ভয়, শহর ছাড়ার তাড়াহুড়া। কলকাতায় পাড়ি জমায় পরিবার,বরিশালে পড়ে থাকে সর্বানন্দভবন, পড়ে থাকে স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির শরীর মুছে যায়। সেখানে ওঠে নতুন দেয়াল, নতুন নাম-ধানসিঁড়ি। কিন্তু কবিতার ধানসিড়ি আর ইট-সিমেন্টের ধানসিড়ি এক নয়।
স্মৃতি রক্ষার চেষ্টা, বাস্তবতার ধাক্কা
জীবনানন্দ দাশের বাড়ি সংরক্ষণের দাবিতে ১৯৯৯ সালে বরিশালের ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সেখানে দাবি পূরণের আশ্বাস মিলেছিল। তবে বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ২০০৮ সালে জেলা পরিষদের উদ্যোগে সেখানে ‘জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পাঠাগার ও মিলনায়তন’ নির্মাণ করা হয়। বগুড়া রোডের একাংশ কবির নামে নামকরণও করা হয়।
কিন্তু আজ বাস্তবতা কঠিন। পাঠাগার নিয়মিত খোলা হয় না। কবির বই, গবেষণা গ্রন্থের সংগ্রহ সীমিত। মিলনায়তন বেশি পরিচিত কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে। আর ‘জীবনানন্দ দাশ সড়ক’ নামটি এখনও মানুষের মুখে পুরোপুরি জায়গা করে নিতে পারেনি। বগুড়া রোড নামের দীর্ঘ অভ্যাস সহজে মুছে যায়নি এখনও।
কবি হেনরী স্বপন বলেন, তবু জীবনানন্দ দাশ বরিশাল থেকে হারাননি। তিনি বছরের পর বছর বেঁচে থাকবে কবিতায়। তিনি আছেন কীর্তনখোলার হাওয়ায়, বিকেলের রোদে, শহরের পুরনো সড়কে।
ধানসিঁড়ি কাগুজে হলেও শহরের বগুড়া রোড নামটি মুখে মুখে ফেরে, ঠিক যেমন তাঁর কবিতার পঙ্ক্তি ফেরে অজান্তে। জন্মদিনে তাই বরিশাল শুধু স্মরণ করে না, নীরবে দীর্ঘশ্বাসও ফেলে। কারণ এই শহর জানে, জীবনানন্দ দাশ মানে শুধু একজন কবি নন, তিনি বরিশালের ভাষা, বরিশালের নিঃসঙ্গ সৌন্দর্য।
রূপসী বাংলার কবি এখানে জন্মেছিলেন বলেই, আজও এই শহরের আকাশ একটু বেশি নীল, একটু বেশি বিষণ্ন।
এফপি/এমআই