নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই ভোটারদের মধ্যে বাড়ছে কৌতূহল, আলোচনা ও উৎকণ্ঠা। কর্মী-সমর্থকদের দৌড়ঝাঁপ চোখে পড়ছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। কেউ ব্যস্ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণায়। আর এই পুরো নির্বাচনী আবহে সবচেয়ে বেশি সরগরম হয়ে উঠেছে গ্রামের টং দোকানের রং চায়ের কাপ।
গ্রামের চায়ের দোকানগুলো এখন যেন অঘোষিত রাজনৈতিক মঞ্চ। প্রার্থী কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে—তা নিয়েই তুমুল আলোচনা। কখনো কখনো নিজ নিজ দলের প্রার্থীকে এগিয়ে রাখতে গিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে জড়িয়ে পড়ছেন তর্কে-বিতর্কে। কোথাও কোথাও সেই দ্বন্দ্ব রূপ নিচ্ছে হাতাহাতিতে। এমনকি ভোটের ভিন্ন মতের কারণে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও টানাপোড়েনের খবর মিলছে।
এক চায়ের দোকানে বসে এক ভোটারকে বলতে শোনা যায়, “ভোট আমার নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু মিছিলে সবারটাতেই যাই। কাউকে মন খারাপ করাতে পারি না।” আবার কোথাও আবেগের বশে চায়ের দোকানে বসেই ঘরের বউকে তালাক দেওয়ার ঘোষণার মতো চরম ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় শিক্ষক আলমগীর বলেন, “চায়ের দোকানগুলোতে এখন নির্বাচনই একমাত্র আলোচনার বিষয়। পড়াশোনা, বাজারদর সব কিছু চাপা পড়ে গেছে।”
অন্যদিকে মাহমুদ নামের এক ভোটার জানান, “মাঠে আগের মতো আমেজ নেই। আমেজ চলে গেছে ফেসবুকে। মোবাইলেই এখন সভা, প্রচারণা আর বিতর্ক।”
প্রার্থী ও দলের সমর্থকরা নিজ নিজ ফেসবুক আইডি, গ্রুপ ও হোয়াটসঅ্যাপে চালাচ্ছেন প্রচারাভিযান। অনেক ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল প্রচারণায় এক প্রার্থী অন্যদের তুলনায় যোজন যোজন এগিয়ে বলেও মন্তব্য করেন স্থানীয়রা। এর প্রভাব পড়ছে বাস্তব রাজনীতিতেও। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, নিজেদের প্রার্থীর আশপাশে অন্য দলের কর্মীদের দাঁড়াতেই দেওয়া হচ্ছে না।
তবে এই নির্বাচনে আগের মতো খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন, মেজবান কিংবা গণভোজ নেই—এ নিয়ে আক্ষেপ দোকানদারদের। এক দোকানদার বলেন, “আগে ভোট এলেই বেচাবিক্রি বাড়ত। এখন শুধু আলোচনা, বিক্রি নাই। মাঝে মাঝে আলোচনার ফাঁকে কয়েকটা গ্লাস ভাঙে, ক্ষতি হয়।”
নির্বাচনী আমেজ না থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছে কম্পিউটার ও ফটোকপি দোকানগুলোও। আগে ভোটার তালিকা, পোস্টার, লিফলেট ছাপাতে দিনরাত ব্যস্ত থাকতেন তারা। এখন সেই ব্যস্ততা আর নেই।
জাহেদ নামের এক ভোটার আগের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, “গতবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ফজরের নামাজের পর থেকেই নির্দিষ্ট দলের লোকজন ভোট দিয়ে কাউকে কেন্দ্রে যেতে দেয়নি। পুলিশ, কোস্ট গার্ড সবাই ছিল, তবু কিছু হয়নি। এবারও কি তাই হবে?”—এই প্রশ্ন ঘুরছে অনেকের মনে।
এদিকে বিভিন্ন প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল ভোট কারচুপি, ভয়ভীতি ও প্রলোভনের অভিযোগ তুলছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা জিয়াউল হক এক জনসভায় অভিযোগ করেন, পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কালো তালিকা করা হচ্ছে এবং ভোটের পর দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ধানের শীষ প্রতীকের জনসভা থেকে জানানো হয়েছে, ভোটের রাতে কেন্দ্র পাহারা দেওয়া হবে।ভোট কারচুপি করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনী মাঠে এখনো প্রশাসন সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রহসনের নির্বাচন করতে চাইলে জনগণ তা রুখে দেবে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে কুতুবদিয়া-মহেশখালী অঞ্চলে উত্তেজনা, আলোচনা আর শঙ্কার মিশ্র আবহ। মাঠে কম, কিন্তু টং দোকান, মোবাইল স্ক্রিন আর ফেসবুকে জমে উঠেছে ভোটের রাজনীতি। শেষ পর্যন্ত ভোটের দিন কী চিত্র দেখা যাবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো এলাকা।
এফপি/জেএস