মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা। মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে শক্তিশালী স্ট্রাইক গ্রুপ ইরানি জলসীমার সন্নিকটে পৌঁছানোয় পুরো অঞ্চলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে এবারের পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন যদি তেহরানের ওপর কোনো সামরিক হামলা চালায়, তবে ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার ধরন এবার আর আগের মতো পরিমিত বা সতর্ক নাও হতে পারে। উল্টো ইরান সর্বশক্তি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ইরান সাধারণত সরাসরি সংঘাত এড়াতে কিছুটা সময় নিয়ে এবং সীমিত পরিসরে পাল্টা আঘাত করে। উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার কথা বলা যায়। সে সময় হামলার ঠিক পরের দিন কাতারের মার্কিন আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, সেই হামলার আগে ইরান আগাম সতর্কবার্তাও দিয়েছিল যাতে প্রাণহানি এড়ানো যায়। ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডের পরেও আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে হামলার ক্ষেত্রে একই ধরনের রাখঢাক দেখা গিয়েছিল। লক্ষ্য ছিল একটাই, নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করা, কিন্তু বড় কোনো যুদ্ধ ডেকে না আনা।
কিন্তু ২০২৬ সালের এই প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে সেই পুরোনো সমীকরণ আর খাটছে না। এর প্রধান কারণ ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। গত ডিসেম্বরের শেষভাগ থেকে ইরানে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর অর্থনৈতিক ধসের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন খোদ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে মোড় নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, সরকারের কঠোর দমনপীড়নে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে প্রকৃত চিত্র এখনো বিশ্বের আড়ালে রয়ে গেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র বসে থাকবে না। ট্রাম্পের এই লকড ও লোডেড অবস্থানের বিপরীতে তেহরান এখন এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে। একদিকে ঘরের ভেতরে টালমাটাল অবস্থা, অন্যদিকে সীমান্তে মার্কিন রণতরীর গর্জন। ইরানি নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এবার যদি তারা আগের মতো কেবল প্রতীকী প্রতিশোধ নিয়ে শান্ত থাকেন, তবে তা দেশের ভেতরে তাদের দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পাবে এবং বিক্ষোভকারীদের আরও সাহসী করে তুলবে।
অন্যদিকে, ইরানের সামরিক কমান্ডাররা এবার সরাসরি যুদ্ধের হুমকি দিয়ে রেখেছেন। তারা জানিয়েছেন, হামলার মাত্রা যাই হোক না কেন, সেটিকে পুরোদস্তুর যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইসরায়েলও চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। কারণ ইরান যদি তাৎক্ষণিক এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার পথ বেছে নেয়, তবে তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং দাবানলের মতো পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ানোর মার্কিন প্রতিশ্রুতি এবং ইরানের সামরিক শক্তির বর্তমান সীমাবদ্ধতা; সব মিলিয়ে এক জটিল সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছে। জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আক্রমণে ইরানের পারমাণবিক এবং সামরিক অবকাঠামো এমনিতেই বেশ ক্ষতিগ্রস্ত। এই দুর্বলতা একদিকে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করতে পারে। আবার অন্যদিকে কোণঠাসা বাঘের মতো মরণকামড় দেওয়ার প্ররোচণাও দিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাইছেন এমন বিজয় যা তাকে বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী রূপে হাজির করবে। কিন্তু তিনি নিজেও হয়তো এক অন্তহীন যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নন। আবার ইরানি নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো সময়। তারা যদি পাল্টা আঘাতে দেরি করে, তবে জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে ঠেকবে। আবার দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে কোনো ভুল হিসাব কষলে তা পুরো শাসনব্যবস্থার পতনও ডেকে আনতে পারে।
এই মরণপণ দাবার চালে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবে তা অনিশ্চিত। তবে এই উত্তেজনার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ ইরানিদের। যারা একদিকে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করছে, আর অন্যদিকে যুদ্ধের বিভীষিকার নিচে দাঁড়িয়ে আগামীর দিন গুনছে।
সূত্র: বিবিসি
এফপি/অ